রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় এক নারী শিক্ষার্থীকে চাকু বের করে ভয় দেখানো, পিস্তলের ভয় দেখানো এবং পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ উঠেছে। একই বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এই গুরুতর হয়রানির দাবি জানিয়ে গত রোববার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগী ছাত্রী।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী। আর অভিযুক্ত মহসিন আলম একই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র।
লিখিত অভিযোগে ওই ছাত্রী জানান, গত ২২ জুলাই থেকে অভিযুক্ত মহসিন আলম তাঁকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও মানসিকভাবে হয়রানি করে আসছিলেন। এর একপর্যায়ে তিনি ওই ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিলে মহসিন ক্ষিপ্ত হয়ে পকেট থেকে চাকু বের করে ভয় দেখান এবং কাছে পিস্তল থাকার কথা বলে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় গতকাল বেলা তিনটার দিকে মহসিন জোরপূর্বক ওই ছাত্রীকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী পদ্মার পাড়ে নিয়ে যান। সেখানে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেমের প্রস্তাব দিলে ভুক্তভোগী আবারও তা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে অভিযুক্ত ছাত্র পুনরায় পকেট থেকে চাকু বের করে ভয় দেখান এবং পিস্তলের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।
পরবর্তীকালে ভুক্তভোগী কান্নাকাটি শুরু করলে তাঁকে প্রথমে ছাত্রীনিবাসের দিকে নেওয়া হয়। তবে সেখান থেকে রুয়েট এলাকা ঘুরে পুনরায় পদ্মার পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একপর্যায়ে তাকে পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। চরম আতঙ্ক ও কান্নাকাটির পর শেষ পর্যন্ত ছাত্রীকে তাঁর মেসে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী ছাত্রী আরও জানান, মেসে পৌঁছানোর মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মাথায় অচেনা বিভিন্ন নম্বর থেকে তাঁর মুঠোফোনে কল আসতে শুরু করে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে দাবি করা হয় যে, মহসিন আলম আত্মহত্যা করেছেন। একই সঙ্গে ঘটনার দায় চাপিয়ে ওই ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে জানা যায়, ঘটনাস্থলে অভিযুক্তের সঙ্গে আরও দুজন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরাও ফোন করে ছাত্রীকে জানান যে মহসিনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, পুরো বিষয়টিই তদন্তের গতি অন্যদিকে মোড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে।
ক্যাম্পাস সূত্রে গুঞ্জন ওঠে, অভিযুক্ত মহসিন আলম জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কর্মী। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সুলতান আহমেদ জানান, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ছাত্রদলের কোনো সক্রিয় কর্মী বা তাদের নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন না। তিনি আরও বলেন, “অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা উচিত। যদি তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।”
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান জানান, ভুক্তভোগী ছাত্রীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁর বক্তব্য বিস্তারিত শোনা হয়েছে।
অভিযুক্তের হাসপাতালে ভর্তির বিষয়ে প্রক্টর মন্তব্য করেন, “এক পক্ষের কথা শুনে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে অভিযুক্তের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি কিছুটা রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মধ্যেও কিছু অসংগতি পরিলক্ষিত হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, আজ দুপুরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী, ঘটনার সময় উপস্থিত অন্য দুজনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। সবার বক্তব্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।