রাজধানী ঢাকার মিরপুরে রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবারও রক্তাক্ত হলো রাজপথ। কাফরুল এলাকা সংলগ্ন চায়ের দোকানে আড্ডারত অবস্থায় যুবদল কর্মীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ইউসুফ আলী পারভেজ (৪৫) নামের এক কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও এক রাজনৈতিক কর্মী ও এক পথচারী গুরুতর আহত হন। পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান ও ঘটনাস্থল থেকে গণপিটুনির শিকার শুটারকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে জানা গেছে, এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং চুক্তিভিত্তিক পেশাদার খুনিদের ব্যবহার।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার রাতে মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকার কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর বাসার পাশের একটি চায়ের দোকানে। স্থানীয়দের বর্ণনা ও যুবদল নেতা হাফিজুলের ভাষ্যমতে, এলাকাটির একটি জানাজা শেষ করে অনুসারীদের নিয়ে তিনি সেখানে চায়ের আড্ডায় যুক্ত হন। ওই সময় চায়ের দোকানের কাছেই দুজন অপরিচিত যুবককে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।
বিষয়টি নজরে এলে পারভেজ এগিয়ে যান এবং ওই দুই ব্যক্তির কাছে আগমনের পরিচয় ও কারণ জানতে চান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের মধ্যকার এক যুবক আচমকা কোমর থেকে স্বয়ংক্রিয় পিস্তল বের করে খুব কাছ থেকে পারভেজের বুক লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যে পারভেজ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে হাফিজুল ও আরেক কর্মী মনির এগিয়ে গেলে তাদের উদ্দেশ্য করেও এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়। হাফিজুল কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করতে পারলেও মনির ও কাছে থাকা সালাম সরদার নামের এক সবজি বিক্রেতা গুলিবিদ্ধ হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তকারী সূত্র এবং সিসিটিভি ফুটেজের বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে, হামলাকারীদের মূল টার্গেট ছিলেন যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবু, পারভেজ নন। এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা, আধিপত্য বিস্তার এবং আসন্ন স্থানীয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা নিশ্চিত করা নিয়ে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শক্তিশালী একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে হাফিজুলের তীব্র বিরোধ চলছিল।
বিরোধের জল গড়ায় সুদূর ঝিনাইদহ পর্যন্ত। হাফিজুলকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঝিনাইদহ এলাকা থেকে চারজন পেশাদার চুক্তিভিত্তিক খুনিকে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ঢাকায় আনা হয়। তারা চারদিন আগে ঢাকায় পৌঁছে মিরপুর ১০ নম্বরের একটি আবাসিক হোটেলে ঘাঁটি গাড়ে এবং কাফরুল এলাকায় হাফিজুলের বাড়ি ও ব্যক্তিগত কার্যালয় কয়েক দফায় রেকি করে অবস্থান শক্ত করে।
হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালানোর সময় স্থানীয় জনতার সাহসিকতায় অস্ত্রসহ চঞ্চল মোল্যা (৩৪) নামের এক শুটার হাতেনাতে আটক হয়। অন্য তিন সহযোগী ফাঁকা গুলি ছিটাতে ছিটাতে চত্বর ত্যাগ করে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অস্ত্রসহ চঞ্চলকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চারজন অপরাধী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ছক অনুযায়ী হামলা চালাতে এসেছল।
এই ভয়াবহ ঘটনায় কাফরুল থানায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। নিহত পারভেজের ভাই মাসুদ রানা বাদী হয়ে প্রথম মামলাটি দায়ের করেন, যেখানে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেন তাঁর ভাই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বলিকাতিল হয়েছেন, পারভেজ আসামিদের আসল লক্ষ্য ছিল না। দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করেন কাফরুল থানার এসআই শ্যামল কুমার হালদার, যা অস্ত্র সংক্রান্ত।
মামলায় আটক চঞ্চলসহ অন্য চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্য তিন আসামিরা হলেন—জিহাদ মোল্লা (৩৪), জিয়ারুল মোল্লা (৩৯) ও হাসান (৩৫)। পুলিশ চঞ্চলকে আদালতে সোপর্দ করে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে, যাতে এই অর্থায়ন ও নির্দেশদাতাদের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়।
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের দায়িত্বশীল মহল থেকে জানানো হয়েছে, পুলিশি তদন্তে যদি নিজস্ব সংগঠনের কোনো নেতার সম্পৃক্ততার প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।