ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা ঋণখেলাপির দায়ে উচ্চ আদালত কর্তৃক বাতিল করার বিষয়টি এবার গড়িয়েছে জাতীয় সংসদে। এই রায়কে কেন্দ্র করে সংসদে নতুন করে ‘ঋণখেলাপি’ বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নাজিবুর রহমান।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে নাজিবুর রহমান আদালতের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “আজকে ঋণখেলাপির দায়ে একজন ব্যক্তির মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এমতাবস্থায় আমরা কি এখন বলতে পারব যে, উনি প্রকৃতপক্ষে ঋণখেলাপি ছিলেন?”
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য গত ১৮ জুনের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। সেদিন সংসদে দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদে’ দাঁড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে। ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সে সময় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
নাজিবুর রহমান সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, “কয়েক দিন আগে আমাদের একজন সম্মানীত সংসদ সদস্য আপনার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, এই সংসদে কোনো ঋণখেলাপি সদস্য আছেন কি না? তখন আপনার আসন থেকে বলা হয়েছিল, বিষয়টি যেহেতু বিচারাধীন, তাই এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না। কিন্তু আজ যখন উচ্চ আদালত ঋণখেলাপির দায়ে একজনের প্রার্থিতা বাতিল করে দিল, তখন তো বিষয়টি আর অমীমাংসিত থাকছে না।”
জামায়াত এমপির এই প্রশ্নের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাৎক্ষণিকভাবে জানান, এটি কোনো পয়েন্ট অব অর্ডার হতে পারে না। স্পিকার তাঁর রুলিংয়ে বলেন, “কোনো একজন সদস্যের সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি থাকবে না, সেই আইনি ও সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের (ইসি)।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে নির্বাচন কমিশন যদি কোনো চূড়ান্ত আদেশ বা প্রজ্ঞাপন জারি করে, তবেই কেবল সংসদকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো সম্ভব হবে। এর আগে এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না উল্লেখ করে স্পিকার সবাইকে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করার আহ্বান জানান।
স্পিকারের বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি গত ১৮ জুনের বিতর্কের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “আমরা সেদিনও সংসদের ফ্লোরে অত্যন্ত পরিষ্কার করে বলেছিলাম যে, এই সংসদে কোনো ঋণখেলাপি সদস্য নেই। কেউ সাময়িকভাবে ঋণগ্রস্ত থাকতে পারেন, তবে তা ঋণখেলাপির পর্যায়ে পড়ে না।”
আসলাম চৌধুরীর প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কড়া ভাষায় বলেন, “আজকে মাননীয় সদস্য যে প্রসঙ্গটি এখানে উত্থাপন করেছেন, সেটি ইতিমধ্যেই আদালত দ্বারা ফয়সালা হয়ে গেছে। তবে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে এই পবিত্র সংসদে এসে শপথ গ্রহণ করেননি। ফলে তিনি কোনোভাবেই এই সংসদের সদস্য নন। তাঁর প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল এবং উচ্চ আদালত সেই চ্যালেঞ্জের মুখে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেছেন। আইন অনুযায়ী এটাই শেষ কথা। তিনি যদি এই সংসদের সদস্য হতেন, তবে এই বিতর্ক তোলার সুযোগ থাকত। যেহেতু তিনি সদস্য নন, তাই এটি কোনো পয়েন্ট অব অর্ডার হতে পারে না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আইনি ও যৌক্তিক ব্যাখ্যার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। স্পিকার বলেন, “পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমার। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যাটি সম্পূর্ণ সঠিক যে, আসলাম চৌধুরী এই সংসদের সদস্য নন।”
চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক গুঞ্জন আদালতের এই নাটকীয় রায়ের পর চট্টগ্রাম-৪ নির্বাচনী এলাকায় নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের পর এই আসনে এখন ধানের শীষের বা বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। আসনটিতে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া বা নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।