রংপুরে শিল্পায়নের সংকট: দেশের ২৫% খাদ্যের জোগান দিয়েও কেন রংপুর দারিদ্র্য? - Uttorpatro TV রংপুরে শিল্পায়নের সংকট: কৃষি সম্ভাবনার অঞ্চলেও বাড়ছে ঢাকাুখী শ্রমিকের স্রোত

রংপুরে শিল্পায়নের সংকট: দেশের ২৫% খাদ্যের জোগান দিয়েও কেন রংপুর দারিদ্র্য?

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১৬, ২০২৬
ছবিঃ উত্তরপত্র

ভুঁই নিড়ানি, রাজমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি থেকে শুরু করে হেলপারি—সব ধরনের কাজে পারদর্শী ৫০ বছর বয়সী জাহিদুল ইসলাম। নিজ এলাকা নীলফামারীর ডিমলায় কাজের অভাব দেখে বছর তিনেক আগে রংপুর শহরে এসেছিলেন এই কৃষিশ্রমিক। বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজে দক্ষতা থাকার পরও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি তার। রংপুরের শাপলা চত্বরে বাজারের ব্যাগে দু-জোড়া জামাকাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জাহিদুল আক্ষেপ করে বলছিলেন, “যেটে নিয়া যায়, সেটে যাই। তা–ও একদিন কাজ পাই, তো আরেক দিন পাই না।”

এটি কেবল জাহিদুলের একার গল্প নয়, রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার শ্রমিকের ভাগ্যলিপি এখন এই অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো এই অঞ্চলে ভারী শিল্প, গার্মেন্টস বা বড় কোনো রপ্তানিমুখী কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে কৃষির ওপর নির্ভরশীল এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ বছরের একটা দীর্ঘ সময় ‘মৌসুমি বেকারত্বে’ ভোগেন।

সরকারি তথ্যমতে, দেশের সামগ্রিক খাদ্য সুরক্ষায় রংপুর বিভাগের অবদান ঈর্ষণীয়। জাতীয় কৃষি উৎপাদনের প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ আসে এই বিভাগ থেকে। ধান, আলু এবং ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে রংপুর ধারাবাহিকভাবে দেশের শীর্ষে অবস্থান করছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই বিভাগের নিট আবাদি জমির পরিমাণ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ (৭৫.৬ শতাংশ) এবং শস্যের নিবিড়তাও সবচেয়ে বেশি (২২২ শতাংশ)। অর্থাৎ, এখানকার উর্বর জমিতে বছরে দুবারেরও বেশি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট উৎপাদিত চালের প্রায় ১৭ শতাংশ এসেছে রংপুর থেকে। শুধু তাই নয়, দেশের মোট আলু উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশ জোগান দেয় রংপুরের আট জেলা। এর বাইরে হাঁড়িভাঙা আম, দিনাজপুরের লিচু এবং সমতলের চা এই অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দেশে উৎপাদিত মোট ভুট্টার অর্ধেকেরও বেশি (২.৮২ মিলিয়ন টন) উৎপাদিত হয় এই বিভাগে, যার মধ্যে দিনাজপুর জেলা শীর্ষে।

অবদান বিপুল, তবু দারিদ্র্য কেন?

কৃষিতে এত অভাবনীয় অবদান থাকার পরও রংপুর অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটছে না কেন, সেই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিবিএসের ২০২৪ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেখানে জাতীয় গড় দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ, সেখানে রংপুর বিভাগে এই হার ২৪.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, এই অঞ্চলে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং মৌসুমি কর্মসংস্থানই এই বৈপরীত্যের মূল কারণ। কৃষিকাজ পুরোপুরি মৌসুমভিত্তিক হওয়ায় বছরের একটা বড় সময় শ্রমিকদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। ফলে তাদের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, যা দারিদ্র্যের এই দুষ্টচক্রকে স্থায়ী রূপ দেয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল ওয়াদুদ জানান, রংপুরে পর্যাপ্ত শিল্পায়ন না হওয়ায় গ্রামগঞ্জের নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে রাজধানী বা অন্য বড় শহরে গিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ খুঁজছেন। সম্প্রতি এই ঢাকাুখী স্রোত আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

রংপুর বিভাগের এই অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিল্পায়নের অভাব। অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদের ২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে দেশের মোট ২৬ হাজার ৪৪৬টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে রংপুরের আট জেলায় ছিল মাত্র ১ হাজার ১৫৬টি। অর্থাৎ, দেশের মোট শিল্প উৎপাদনের মাত্র ৪.৩৭ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের ৪.৩০ শতাংশ ছিল এই অঞ্চলে।

বর্তমানেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্যমতে, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মাত্র ১১.৪১ শতাংশ রয়েছে রংপুর বিভাগে। অথচ ঢাকা বিভাগে তা ২৭.০৮ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭.৫১ শতাংশ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নব্বইয়ের দশকে এই অঞ্চলে চালকল এবং বিড়ি কারখানাভিত্তিক কিছু কর্মসংস্থান হলেও, গত তিন দশকে এখানে কোনো ভারী বা উৎপাদনশীল শিল্প গড়ে ওঠেনি।

সংকট কোথায়?

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, মূলত কয়েকটি কাঠামোগত সংকটের কারণে রংপুরে শিল্পায়ন থমকে আছে:

  • জ্বালানি সংকট: পর্যাপ্ত গ্যাস-সংযোগ না থাকায় উদ্যোক্তারা বড় কোনো শিল্প স্থাপন করতে পারছেন না।

  • ঋণ বৈষম্য: এডিবি বা অন্যান্য বিশেষ তহবিল থেকে রংপুর বিভাগের শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা নেই।

  • অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: উন্নত যোগাযোগ ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প পরিকল্পনা সফল হচ্ছে না।

রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক পার্থ বোস বলেন, “গ্যাস ছাড়া বড় শিল্প টিকে থাকা অসম্ভব। এই অঞ্চলের অনগ্রসরতা কাটাতে অন্তত ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) সুবিধা দেওয়া উচিত।”

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক মনে করেন, রংপুরে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের দুটি বড় ইতিবাচক দিক রয়েছে—প্রথমত, পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন কাঁচামাল এবং দ্বিতীয়ত, সুলভ মূল্যে দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা। আলু, ভুট্টা ও আম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুললে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করা সম্ভব।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলাম বলেন, “হাঁড়িভাঙা আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ২৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই আম ও আলুভিত্তিক বিশেষায়িত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন এখন সময়ের দাবি।”

উত্তরের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারের উচ্চপর্যায়েও তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের উত্তরবঙ্গে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ‘রংপুর ইপিজেড’ এবং কুড়িগ্রামে ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানিয়েছেন, কাউনিয়ায় ৪২৮ একর জমিতে একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং বন্ধ শ্যামপুর চিনিকলকে বিকল্প শিল্পে রূপান্তরের পরিকল্পনা চলছে।

সরকারি এই পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে জাহিদুল কিংবা শাপলা চত্বরে কাজের অপেক্ষায় থাকা নির্মাণশ্রমিক সুমনের মতো হাজারো মানুষকে ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকার বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রংপুরের উর্বর ভূমি আর শ্রমিকের ঘামকে শিল্পায়নের ফ্রেমে বাঁধার এখনই উপযুক্ত সময়।