কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নাশকতার আশঙ্কায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ পা দিল তার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে যে দলটির জন্ম হয়েছিল, যারা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টি ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছিল—সেই দলটিই আজ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ আজ ক্ষমতার বাইরেই শুধু নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এবং নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
বিগত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থায় উন্নয়ন ও বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের গল্প থাকলেও, তার আড়ালে থাকা অপশাসন, গুম-খুন এবং তিনটি চরম বিতর্কিত নির্বাচন দলটিকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ফলে, দলটির সামনে এখন টিকে থাকা এবং হারিয়ে যাওয়া জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করার এক দ্বিমুখী ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নাশকতার আশঙ্কায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনেও আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে দেশের মাটিতে দলটির দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক কার্যালয় বা উন্মুক্ত কার্যক্রম নেই। দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা এখন মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে দলটির কিছু সমর্থককে ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেছে। আত্মগোপনে থাকা নেতারা সারা দেশে এই ঝটিকা কর্মসূচির ডাক দিলেও, তা সরকারকে কোনো বড় রাজনৈতিক চাপে ফেলতে পারেনি। উল্টো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীসহ দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পুলিশ-সেনা মোতায়েন করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের একটি অংশ মনে করছে, এই ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে তারা দেশ-বিদেশে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারছে, যা তাদের জন্য এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সাফল্য। তবে দলের ভেতর থেকেই এই কৌশলের তীব্র সমালোচনা উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করছেন, ঝটিকা মিছিলের মতো হঠকারী কর্মসূচি দলটির কোনো স্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং এতে করে যেসকল কর্মী বা নিম্নস্তরের নেতা জামিনে মুক্ত হয়েছেন বা দেশে আছেন, তারা নতুন করে গ্রেপ্তার ও মামলার ঝুঁকিতে পড়বেন। বর্তমান বাস্তবতায় রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি এবং সর্বোপরি দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের সংস্কার আনা প্রয়োজন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরও আওয়ামী লীগ এতটা নেতৃত্বশূন্যতায় ভোগেনি, যতটা ২০২৪ সালের আগস্টের পর তৈরি হয়েছে। সে সময় অনেক নেতা কারাগারে গেলেও দেশে হাল ধরার মতো নেতৃত্ব ছিল। কিন্তু এবারের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং প্রায় সমস্ত কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হয় কারাগারে, না হয় দেশ ছেড়ে পালিয়ে আত্মগোপনে আছেন। ফলে দলটি এখন সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন।
আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি মূলত দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনার চার দশকের একক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি ভাঙনকবলিত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে যান। কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘায়ু দলটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলের চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিয় সংগঠনে পরিণত করে। দলের ভেতর বিকল্প কোনো নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। ফলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে পুরো দল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র শেখ হাসিনাই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি ক্ষমতা হারিয়ে এভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, যা দলটির কোটি কোটি সমর্থকের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের সামনে মূলত চারটি ভবিষ্যৎ পথ খোলা রয়েছে:
১. দীর্ঘমেয়াদি কোণঠাসা অবস্থা: আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জনরোষের কারণে দলটি দীর্ঘ সময় মূলধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়তে পারে। ২. নেতৃত্বের পরিবর্তন ও রূপান্তর: শেখ হাসিনা-নির্ভর কাঠামো থেকে বের হয়ে যদি নতুন প্রজন্মের হাত ধরে দলটির সংস্কার হয় এবং অতীতের ভুলের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়, তবে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ৩. দলীয় বিভাজন: সংকট দীর্ঘায়িত হলে এবং কৌশলগত দ্বিমত বাড়লে অতীতে ভাঙনের ইতিহাস থাকা এই দলটি আবারও একাধিক উপদলে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ৪. অন্যের ভুলের ওপর নির্ভরতা (বর্তমান কৌশল): বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক ভুলের সুযোগ নিয়ে রাজপথে পুনরায় শক্তি প্রদর্শন করে ফিরে আসা। দৃশ্যত, আওয়ামী লীগ এখন এই জুয়া খেলার পথেই হাঁটছে, যা দলটির শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসে ঐতিহ্যবাহী এই দলটির অতীতের গৌরবগাথা এখন ফিকে হয়ে গেছে বর্তমানের চরম ব্যর্থতা আর জনবিচ্ছিন্নতার কাছে। আওয়ামী লীগ কি আত্মশুদ্ধি ও সংস্কারের পথ বেছে নিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পুনর্জন্ম নেবে, নাকি অতীতের স্মৃতির ওপর ভর করে দীর্ঘ রাজনৈতিক অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবে—তা সময়ই বলে দেবে।