রংপুর সিটি করপোরেশনে সাবেক মেয়র মোস্তফার কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল রাজস্ব লুটপাট - Uttorpatro TV আইটি মাস্টারমাইন্ড আরিফুল ও সাবেক মেয়র সিন্ডিকেটের কব্জায় রসিক, উধাও কোটি কোটি টাকার বকেয়া

রংপুর সিটি করপোরেশনে সাবেক মেয়র মোস্তফার কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল রাজস্ব লুটপাট

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 16, 2026
ছবিঃ সংগৃহীত

রংপুর প্রতিনিধি:

জাপানি দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে কেনা আধুনিক কর ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারকে ‘ডিজিটাল হাতিয়ার’ বানিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনে (রসিক) কয়েক শত কোটি টাকার রাজস্ব লুটের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ২০১৯ সালে কোনো প্রকার কারিগরি বা প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই সার্ভারের মূল কোড (Source Code) পরিবর্তন করে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে এক শক্তিশালী লুটেরা চক্র। জাতীয় ছাত্র সমাজের তৎকালীন জেলা আহ্বায়ক ও কর আদায় শাখার কম্পিউটার অপারেটর আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে এবং সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও তার দলীয় সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই মহালুটপাট চালানো হয়। তদন্তে অকাট্য প্রমাণ মিললেও অপরাধীরা দীর্ঘদিন বহাল তবিয়তে ছিল। অতি সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে রসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসানের পাঠানো চিঠির সূত্র ধরে এই অবিশ্বাস্য ডিজিটাল ডাকাতির গল্প প্রকাশ্যে আসে।

অনুসন্ধানে এই চক্রের কর ফাঁকি ও শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অন্তত ১১ ধরনের রোমহর্ষক জালিয়াতির ছক উন্মোচিত হয়েছে:

সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান ছক ছিল ‘ভূতুড়ে হোল্ডিং’। প্রকৃত করদাতাদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায় করে তা সরাসরি পকেটে পুরত এই চক্র। আর সরকারি তহবিলের এই ঘাটতি গোপন করতে সফটওয়্যার থেকে আসল পুরোনো অ্যাকাউন্ট চিরতরে মুছে ফেলা হতো। পরবর্তীতে সেই শূন্য স্থানে নামে-বেনামে নতুন ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আত্মসাৎ করা সমপরিমাণ অর্থকে ‘বকেয়া কর’ হিসেবে দেখিয়ে খাতা-কলমে হিসাব মেলানো হতো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১,০০০টি অ্যাকাউন্ট যাচাই করতেই অন্তত ১৭টি অলীক অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে, যার বিপরীতে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকারও বেশি ভুয়া বকেয়া ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, বাস্তবে যাদের কোনো অস্তিত্ব নেই।

কোনো ধরনের টাকা পরিশোধ ছাড়াই সফটওয়্যারের ডাটাবেজ থেকে এক ক্লিকেই উধাও করে দেওয়া হতো লাখ লাখ টাকার বকেয়া বিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে সরাসরি নগদ টাকা নিয়ে ব্যাংকের ও সিটি করপোরেশনের ভুয়া সিল (Stamp) মেরে রসিদ দেওয়া হতো। গ্রাহক নিশ্চিন্ত থাকলেও ব্যাংকের অফিসিয়াল স্টেটমেন্টে দেখা গেছে কোষাগারে কোনো টাকাই জমা পড়েনি। আকতারুজ্জামান মোল্লা নামের এক গ্রাহকের ৮ অর্থবছরের করের মধ্যে ৭ অর্থবছরের ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়েই সফটওয়্যারে ‘পেইড’ দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

রসিকের এই রাজস্ব লোপাটের সুবিধা নিয়েছে নামী এনজিও ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানও। মর্ডান মোড় এলাকার দর্শনা রোডের খ্যাতনামা এনজিও ‘ব্যুরো বাংলাদেশ’-এর সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও ব্যবহারোপযোগী ১০ তলাবিশিষ্ট ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট’ ভবনটিকে কাগজে-কলমে মাত্র দোতলা দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতি অর্থবছরে রসিককে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার নিশ্চিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে ধাপ রোডের একটি ৫ তলা ভবনকে পুরোনো মালিকের নামে দেখিয়ে বিশাল বকেয়া গোপন করা হয়েছিল।

পুরোনো অনিয়ম ধামাচাপা দিতে একই স্থাপনার বিপরীতে একাধিক ভুয়া হোল্ডিং আইডি খোলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কটকীপাড়া এলাকার ‘প্রশান্তি’ নামের একটি ১০ তলা বিলাসবহুল আবাসিক ভবনের পুরোনো আইডি সচল রেখেই আরেকটি সমান্তরাল আইডি খুলে বার্ষিক কর ধরা হয় মাত্র ৪৭৬ টাকা! অন্যদিকে, উত্তরাধিকার বা বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা নামজারি (খারিজ) ফি আদায় করা হলেও, সেই টাকার কোনো হদিস মেলেনি সিটি করপোরেশনের কোষাগারে।

নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ডিজিটাল প্রমাণ আড়াল করতে সার্ভারের ‘কি-লগ’ এবং বিল পরিবর্তনের পুরো ট্র্যাকিং হিস্টোরি (Digital Log) মুছে দিয়েছে এই আইটি সিন্ডিকেট। শুধু ডিজিটাল নয়, ব্যাংকে বিল জমা দেওয়ার মূল ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, কর রিভিউ ফরম এবং ডিসকাউন্ট সংক্রান্ত নথিপত্র পরিকল্পিতভাবে দপ্তর থেকে সরানো কিংবা পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়েছে। ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ২০২২-২৩ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ব্যাংক ভাউচার পেটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাসের পর মাস কোনো কর আদায়ের ভাউচারই ফাইলে নেই এবং রেজিস্টার খাতায় ব্যাপক ফ্লুইড ও ঘষামাজা করা হয়েছে।

২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায়ের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এই সুসংগঠিত দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণসহ तत्कालीन মেয়রের কাছে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অতি সম্প্রতি জাল বিল প্রস্তুতের অভিযোগে সহকারী কর আদায়কারী মো. আয়েজউদ্দীন এবং বাজার সহকারী মো. আনোয়ারুল হক নামের দুই কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে পর্দার আড়ালের মূল আইটি মাস্টারমাইন্ড আরিফুল ইসলাম, মাসুদ রানা এবং সাবেক কর আদায় প্রধান মোহাম্মদ আলীসহ মূল রাঘববোয়ালরা এখনো অধরা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জাইকার তৈরি এই কর ব্যবস্থাপনার মূল সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কানেক্ট বিডি লিমিটেড’ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং প্রধান ডেভলপারের মৃত্যু হওয়ায় সার্ভারের ব্যাকএন্ডে ঢুকে এই জালিয়াতির পুরো জট খোলার কারিগরি পথও এখন চরম অন্ধকারের মুখে পড়েছে।