থানা পুলিশের অবিশ্বাস্য কাণ্ড: ১ লাখ ইয়াবাসহ কনস্টেবলকে আটকে মামলা না করে ছেড়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য - Uttorpatro TV চট্টগ্রামে পুলিশের ১ লাখ ইয়াবা গায়েব: অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই

থানা পুলিশের অবিশ্বাস্য কাণ্ড: ১ লাখ ইয়াবাসহ কনস্টেবলকে আটকে মামলা না করে ছেড়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 16, 2026
ইমতিয়াজ হোসেন ও আফতাব উদ্দিনছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তখন আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এমনই এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া থানায়। কক্সবাজার থেকে পাচার করে আনা এক লাখ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধারের পর তা মামলা না করে সম্পূর্ণ গায়েব করে দিয়েছে খোদ থানা পুলিশ। শুধু তাই নয়, ইয়াবা বহনকারী পুলিশ সদস্যকে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ওসির নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এই থমকে দেওয়া সত্য উঠে এসেছে। মাদক আত্মসাতের এই ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে ইতোমধ্যে ১০ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও, ঘটনার মূল নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত তৎকালীন ওসির বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ঘটনার পর প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হতে চললেও এখন পর্যন্ত কোনো নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি, উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি আত্মসাৎকৃত বিপুল পরিমাণ ইয়াবাও।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর শাহ আমানত সেতু এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। দীর্ঘদিন বিষয়টি ধামাচাপা থাকলেও সম্প্রতি ইয়াবা বহনকারী ও পুলিশের মধ্যকার একটি কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে এবং চারদিকে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটির ছয় পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদনে ঘটনার আদ্যোপান্ত উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান (কনস্টেবল) ইমতিয়াজ হোসেন মোশাররফ নামের এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী ‘দেশ ট্রাভেলস’-এর একটি বাসে ওঠেন। এর বিনিময়ে তাঁর ৮০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা ছিল।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাসটি কর্ণফুলী নদীর সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও এক সোর্স সাদাপোশাকে বাসে ওঠেন। তাঁরা ঘুমন্ত ইমতিয়াজকে জাগিয়ে তুললে তিনি নিজের পুলিশ আইডি কার্ড দেখান। এরপর তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে সেতু সংলগ্ন পুলিশ বক্সে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর বাসের ভেতর থেকে তাঁর লাগেজটিও পুলিশ বক্সে এনে বাসের চালক ও সুপারভাইজারকে দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে যেতে বলা হয়।

পুলিশ বক্সের ভেতরে ইমতিয়াজের লাগেজটি খোলা হলে সেখানে ১০টি প্যাকেটে মোট এক লাখ ইয়াবা পাওয়া যায়। ওই সময় বক্সে বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ এবং এসআই আল-আমিন সরকার উপস্থিত ছিলেন। ইমতিয়াজ নিজেকে বাঁচানোর অনুরোধ করলে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। এরপর ইয়াবাগুলো নিজেদের জিম্মায় রেখে কাপড়সহ খালি লাগেজটি ইমতিয়াজকে ফেরত দিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে ইমতিয়াজ নগরের অলংকার মোড় হয়ে কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

সিএমপির তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, বাকলিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিনের সরাসরি নির্দেশেই এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা গায়েব করা হয় এবং আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী এটি একটি মারাত্মক আমলযোগ্য অপরাধ হলেও ওসি তা সম্পূর্ণ চেপে যান। এমনকি তিনি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজও ধ্বংস বা গায়েবের ব্যবস্থা করেন, যা পিআরবি ও পুলিশ আইনের পরিপন্থী।

তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন (যিনি বর্তমানে কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্বে আছেন)। তিনি দাবি করেন,

“আমি ইয়াবার বিষয়ে কিছুই জানি না। আমি কোনো মাদক আত্মসাৎ করিনি এবং ঘটনার সময় আমি থানায় নয়, নিজের বাসায় ছিলাম।”

তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কনস্টেবল ইমতিয়াজসহ আট পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়। সর্বশেষ গত ৯ জুন বরখাস্ত করা হয় পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকে। বরখাস্ত হওয়া অন্য সদস্যরা হলেন— এসআই আল-আমিন সরকার, এসআই আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, জিয়াউর রহমান, সাদ্দাম হোসেন, এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও উম্মে হাবিবা স্বপ্না।

আটজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলেও এবং ওসির বিরুদ্ধে সিএমপি থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে শাস্তির সুপারিশ পাঠানো হলেও রহস্যজনকভাবে সাবেক ওসি আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মাদক উদ্ধারের পর মামলা না করে আসামিকে ছেড়ে দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এখানে পর্দার আড়ালে কোনো বেআইনি আর্থিক সুবিধা লেনদেন হয়েছে কি না এবং কেন এখনো নিয়মিত মামলা হয়নি, তা খতিয়ে দেখতে দ্রুত বিচার বিভাগীয় বা নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে সদ্য যোগদান করা চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। এত বড় একটি ঘটনার পর কেন এতদিন নিয়মিত মামলা করা হয়নি, তা তিনি নিজে খতিয়ে দেখছেন এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।