হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ছবি: সাজিদ হোসেন

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ও নৃশংস জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এক দশক আগের সেই কালো রাতের ক্ষত আজও ঢাকাবাসী তথা গোটা বাংলাদেশের মানুষের মনে তাজা। আজ বুধবার ১ জুলাই, সেই নির্মম হামলায় অকালে প্রাণ হারানো সাহসী মানুষগুলোকে স্মরণ করতে এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে এক বিশেষ স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
আজ বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে স্মরণ অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই হামলায় নিহত দেশি-বিদেশি নাগরিকদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত বিশেষ নামফলকের সামনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করার মাধ্যমে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা।
নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে সাহসী তরুণ ফারাজ আইয়াজ হোসেনের বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় অনুষ্ঠানস্থলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী এবং ঢাকায় বসবাসরত প্রবাসী ইতালীয় নাগরিকদের পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। নিহতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা কেবল এই সাহসী ও নিরীহ মানুষগুলোর স্মৃতির প্রতিই সম্মান জানাচ্ছি না, বরং সন্তান ও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর যে অসীম সাহস ও সহনশীলতা, তার প্রতিও কুর্নিশ জানাচ্ছি। একজন মা হিসেবে তাঁদের এই অপূরণীয় ক্ষতি আমি গভীরভাবে অনুভব করতে পারি।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, “উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই জঘন্য অপরাধের পেছনের কুশীলব ও হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে কোনো ধরনের উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসবাদের ঠাঁই নেই এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার কোনো অপচেষ্টাই বরদাশত করা হবে না।”
অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো তাঁর বক্তব্যে এক দশক আগের সেই হামলায় নিহতদের প্রায় সবাই তরুণ ও সম্ভাবনাময় ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “নিহত তরুণেরা প্রত্যেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতেন। আজ তাঁদের শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ হলো বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে স্মরণ করা।” এ সময় তিনি সংকটের মুহূর্তে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো পুলিশ কর্মকর্তাদের সাহসিকতার প্রশংসাও করেন।
রাষ্ট্রদূত আলেসান্দ্রো তাঁর বক্তৃতায় ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লার একটি বিশেষ বাণী উদ্ধৃত করেন। যেখানে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীর মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজনের দেয়াল তৈরি করা। তবে এক দশক পেরিয়ে আজ প্রমাণ হয়েছে যে উগ্রবাদীদের সেই অপচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এর বিপরীতে মানুষের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সংলাপ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যৌথ অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী রূপ নিয়েছে।
স্মরণ অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মা ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান। এছাড়া জাপান ও ইতালির নিহত নাগরিকদের পরিবারের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি এই শোকাবহ মুহূর্তে যোগ দিতে বাংলাদেশে আসেন। কূটনীতিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রদূত আলবার্ট সিয়া, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ রামাদান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ আরও অনেকে।
১০ বছর আগের সেই ট্র্যাজেডি আজ আর কেবলই একটি শোকের দিন নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর জন্য উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে লড়াই করার এক নতুন শপথের দিন।