মে দিবস: উৎসবের রং নেই কাশেম-শুক্কুরদের জীবনে, জীবিকার তাগিদে রাজপথে শ্রমিকের দল - Uttorpatro TV

মে দিবস: উৎসবের রং নেই কাশেম-শুক্কুরদের জীবনে, জীবিকার তাগিদে রাজপথে শ্রমিকের দল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১, ২০২৬
ভ্যানে কলার আঁটি বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছেন চালক আবুল কাশেম। মোহাম্মদপুর, ঢাকা, আজ শুক্রবার সকালে ছবি: আহমেদ উল্যা ইউসুফ

আজ পহেলা মে, মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দিন। বিশ্বজুড়ে যখন শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে, তখন রাজধানীর রাজপথে দেখা গেল ভিন্ন এক চিত্র। উৎসব বা ছুটি নয়, বরং জীবন ও জীবিকার তাগিদে হাড়ভাঙা খাটুনিতেই দিন কাটছে শত শত শ্রমিকের। তাঁদের কাছে মে দিবস মানে কেবলই ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ দিন।

‘মে দিবস কারে কয় জানি না’

ভোর থেকেই কলার আঁটি বোঝাই ভ্যান নিয়ে রায়েরবাজার থেকে নূরজাহান রোডের দিকে আসছিলেন ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আবুল কাশেম। শরীয়তপুরের জাজিরার এই মানুষটির কাছে মে দিবস বা সরকারি ছুটির কোনো অর্থ নেই। জীর্ণ শরীরে ভ্যান টেনে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

তিন ছেলে ও দুই মেয়ে থাকলেও বৃদ্ধ বয়সে নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হয় আবুল কাশেমকে। থাকেন কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় তিন হাজার টাকার একটি ভাড়ায়। বড় ছেলেরা আলাদা সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “যার যার সংসার লইয়া হে পেরেশান। কে কারটা দেখে। নিজের ওপরেই ভরসা।” বয়স বাড়ায় মাসে ১৫-২০ দিনের বেশি কাজ করতে পারেন না, তবুও পেটের তাগিদে ভ্যান নিয়ে নামতে হয় রাজপথে।

ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ১১ তলায় ঘাম ঝরানো কাজ করছিলেন ৫৫ বছর বয়সী শুক্কুর আলী। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা এই শ্রমিকের কাছে দিবস পালনের চেয়ে দৈনন্দিন ‘হাজিরা’ বা মজুরি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শুক্কুর আলী বলেন, “খাই অইল কাজ কইরা, কাজ না করলে খামু কী?” দিনে কাজ করলে মজুরি জোটে, না করলে উপোস থাকতে হয়। মাসে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা আয় দিয়ে স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তানের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। এর মধ্যে ঘরভাড়াই চলে যায় ছয় হাজার টাকা। মে দিবস সম্পর্কে তাঁর সোজাসাপ্টা উত্তর—কখনো জানার প্রয়োজনই পড়েনি।

গৃহকর্মী হুসেনা বেগমের দিন কাটে এক বাসা থেকে অন্য বাসায় ছুটে চলে। মে দিবসের কথা শুনতেই অনেকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, “ওইসব দিবস দিয়া কী অইব।” স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যাওয়ায় দুই ছেলের সংসারের ভার তাঁর একার কাঁধে।

শেখেরটেকে টিনশেড রুমে থেকে তিনটি বাসায় কাজ করে ১২ হাজার টাকা আয় করেন হুসেনা। যার প্রায় অর্ধেকটাই চলে যায় ঘরভাড়ায়। তাঁর কাছে মে দিবস কোনো উৎসবের দিন নয়, বরং মাস শেষ হওয়ার আগে ঘরভাড়া জোগাড় করার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

শহরের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আড়ালে আবুল কাশেম, শুক্কুর আলী বা হুসেনাদের মতো অসংখ্য শ্রমিকের জীবনবাস্তবতা আজও অপরিবর্তিত। মে দিবস আসে, মে দিবস যায়; কিন্তু আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টা বা বিশ্রামের অধিকার আজও এই শ্রেণির মানুষের কাছে অলীক স্বপ্ন মাত্র। তাদের কাছে প্রতিটি দিনই লড়াইয়ের, প্রতিটি দিনই বেঁচে থাকার সংগ্রাম।