
ঢাকা: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
শনিবার দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালতে শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হয়। এর আগে মামলার তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিল পুলিশ।
পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার বিষয়ে সাবেক এই সংসদ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম শনিবার আদালতে রিমান্ডের আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো এবং আঘাত করার অভিযোগ রয়েছে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
পুলিশের দাবি, এ ঘটনার ফলে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হয়। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে দেশে ফেরা যাত্রীদের স্বাভাবিক আগমন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখতে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাইলেও আদালত শুনানি শেষে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়ায় সেখানে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। ফলে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে যাত্রীসেবা ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে আখতারুজ্জামানের আচরণ এবং কথাবার্তার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং সেখানে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা বিস্তারিতভাবে জানতে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ জন্যই আদালতের কাছে পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করেছিল।
রিমান্ড আবেদনে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করেছে পুলিশ। বিমানবন্দরের ভেতরে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার পেছনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইন্ধন ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে আবেদনে বলা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির পেছনে কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল কি না এবং এর মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
তবে এটি পুলিশের রিমান্ড আবেদনে উত্থাপিত তদন্তের বিষয়—আদালতের আদেশে ওই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমনটি নয়। তদন্তের পর এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে।
এর আগে গত ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন ধামাল কোট এলাকার ১০ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বরের নিজ বাসা থেকে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর তাকে বিমানবন্দর থানার মামলায় আদালতে হাজির করা হয়। এরপর ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা এবং অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে পুলিশ রিমান্ড আবেদন করে।
শনিবার সেই আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এক দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। ফলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ পাবেন।
মামলার অভিযোগের সূত্র অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে ওই ঘটনার সূত্রপাত। বিমানবন্দরে লাগেজ সংগ্রহ এবং ট্রলি পাওয়া নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগে উঠে এসেছে।
এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সঙ্গে বাধার সৃষ্টি এবং হুমকি-ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ এখন ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করছে।
তদন্তে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকলে সেগুলোও তদন্তে বিবেচনা করা হতে পারে।
এক দিনের রিমান্ডে পুলিশ ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং অভিযোগের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আখতারুজ্জামানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে তিনি কারও প্ররোচনা বা নির্দেশনায় কোনো কর্মকাণ্ড করেছিলেন কি না, ঘটনার সময় ঠিক কী হয়েছিল এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগের বাস্তবতা কী—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
তবে আদালতের রিমান্ড আদেশ কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে না। মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার পর অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ প্রতিবেদন দেবে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় আদালত বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে চলমান মামলায় এখন তদন্ত কার্যক্রমই মূল বিষয়। এক দিনের রিমান্ড শেষে তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।