ডিজিটাল হচ্ছে বিয়ে-তালাক নিবন্ধন, ঠেকানো যাবে গোপন বিয়ে ও বাল্যবিবাহ - Uttorpatro TV

ডিজিটাল হচ্ছে বিয়ে-তালাক নিবন্ধন, ঠেকানো যাবে গোপন বিয়ে ও বাল্যবিবাহ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: October 3, 2026

জাতীয়: দেশের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির আগের বিবাহের তথ্য যাচাই করা সহজ হবে। ফলে তথ্য গোপন করে একাধিক বিয়ে এবং বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর সহায়তা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর নিকেতনে ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের জন্য আয়োজিত ‘অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনে সফটওয়্যারের ব্যবহারবিধি’ শীর্ষক ১০ দিনব্যাপী আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব তথ্য জানান। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে একই তথ্য পাওয়া গেছে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অনলাইনে বিবাহ ও তালাকের তথ্য সংরক্ষণ করা হলে দেশের নিবন্ধন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে কোনো ব্যক্তি আগে কোথাও বিয়ে করেছেন কি না, তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যে ধরনের তথ্যগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, ডিজিটাল ব্যবস্থায় তা কমিয়ে আনার সুযোগ থাকবে।

এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সংযোগ

নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিবাহ নিবন্ধনের তথ্যকে অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করা। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে বিবাহ নিবন্ধনের অনলাইন তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন এবং পাসপোর্টের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।

এর ফলে একজন নাগরিকের পরিচয় ও বৈবাহিক অবস্থার তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সমন্বিত একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডারে নিবন্ধিত তথ্য থাকলে কোনো ব্যক্তির বিবাহিত বা অবিবাহিত অবস্থার বিষয়ে যাচাই করা সহজ হবে।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, অনলাইনে বিবাহের তথ্য সংরক্ষিত থাকলে কোনো ব্যক্তি আগে কোথাও বিয়ে করেছেন কি না, তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা সম্ভব হবে। কেউ আগের বিয়ের তথ্য গোপন করে অন্যত্র নতুন করে বিয়ে নিবন্ধনের চেষ্টা করলে তার পূর্ববর্তী বিবাহের তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সহায়তা

ডিজিটাল বিবাহ নিবন্ধন ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়টি তুলে ধরেছেন আইনমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হলে একজন ব্যক্তির পূর্ববর্তী বিবাহের তথ্য গোপন করা কঠিন হবে।

একইভাবে বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বিয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও বয়স সম্পর্কে তথ্য যাচাই আরও সহজ করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে পুরো ব্যবস্থাটি কার্যকরভাবে চালু করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীদের প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। এ কারণে পর্যায়ক্রমে দেশের সব কাজীকে ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় আনার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

সব কাজীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ

রাজধানীতে শুরু হওয়া ১০ দিনব্যাপী আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের সফটওয়্যার ব্যবহারের বিষয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য কাজীকেও একই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মাধ্যমে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের তথ্য নির্দিষ্ট সফটওয়্যারে সংরক্ষণ, তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধেও কাজে আসতে পারে

ডিজিটালভাবে বিবাহ নিবন্ধনের তথ্য সংরক্ষণের আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধার কথাও জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের পক্ষ থেকে একাধিক দাবি উঠলে নিবন্ধিত বিবাহের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সহজ হতে পারে।

এ ধরনের তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হলে বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের বিষয়কে কেন্দ্র করে মামলা-মোকদ্দমার চাপ কমানোর সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

বিদেশে থাকা নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সুবিধা

বিদেশে অবস্থানরত বা ভবিষ্যতে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে এমন নাগরিকদের জন্যও ডিজিটাল বিবাহ নিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

অনলাইনে নিবন্ধিত তথ্য থাকলে বিদেশে কোনো ব্যক্তির বৈবাহিক সম্পর্ক যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য দ্রুত যাচাই করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীকে বিদেশে নেওয়ার মতো ক্ষেত্রে বিবাহের বৈধতা ও সম্পর্কের তথ্য যাচাইয়ে ডিজিটাল রেকর্ড সহায়ক হতে পারে।

ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রারদের পদায়নেও পরিবর্তন

বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটাল করার উদ্যোগের পাশাপাশি ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রারদের পদায়ন নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার প্রভাব কমাতে ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রারদের পদায়নের ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি বা পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের তদবিরের বিষয় উঠে আসে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে শিগগিরই কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ দেশের নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। এনআইডি, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে বিবাহ নিবন্ধনের তথ্য পর্যায়ক্রমে যুক্ত হলে পরিচয় ও বৈবাহিক অবস্থা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও সমন্বিত হতে পারে। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে দেশের সব কাজীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।