
ঢাকা: রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে সৎ মেয়েকে একাধিকবার ধর্ষণের দায়ে জামাল নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় আদালত তাকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও দিয়েছেন। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে তা আদায় এবং ভুক্তভোগীকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে তার বিরুদ্ধে সাজার পরোয়ানা জারি করে আবার কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আব্দুল মজিদ জানান, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য, জেরা, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার বিচারকাজে বিভিন্ন ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে ভুক্তভোগীর বক্তব্য, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফল বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সন্তোষ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সঠিক তদন্ত, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণের সমন্বয়ে মামলাটির বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
আইনজীবী জানান, প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। রায় ঘোষণার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আপিল করা যেতে পারে।
আদালতের রায়ে অর্থদণ্ডের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। জামালকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং এই অর্থ ভুক্তভোগীকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসামি জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর। ওই দিন আসামি তার স্ত্রীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঘরে থাকা সৎ মেয়েকে ধর্ষণ করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে একাধিকবার একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে কিশোরী ভুক্তভোগী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। তার শারীরিক অবস্থায় বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিলে বিষয়টি তার মায়ের নজরে আসে। পরে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ভুক্তভোগীর মা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৪ সালে ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানায় ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলা হওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
মামলাটির বিচার চলাকালে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের মোট নয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তাদের বক্তব্যের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর দেওয়া জবানবন্দি, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য আলামত আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
মামলার তদন্তের সময় ভুক্তভোগীর ২২ ধারার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি তার চিকিৎসা পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষার ফল আদালতে উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষার ফলাফলে ভুক্তভোগীর গর্ভের সন্তানের জৈবিক পিতা হিসেবে আসামি জামালকে শনাক্ত করা হয়। এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল মামলার অন্যান্য সাক্ষ্য ও নথির সঙ্গে আদালত বিবেচনা করেন।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন হওয়ার পর আদালত উপস্থাপিত প্রমাণগুলো পর্যালোচনা করেন। এরপর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।
শিশু ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ না করার বিষয়টিও আইন ও সাংবাদিকতার নীতিমালায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাই আদালতের রায়ের তথ্য প্রকাশের সময় ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
আদালতের রায়ে জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগীকে দেওয়ার নির্দেশও মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ দিক। অর্থদণ্ড আদায় করা সম্ভব না হলে আসামির সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের পর এখন মামলাটি পরবর্তী আইনগত ধাপে যাবে। আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করলে সেখানে রায় ও মামলার নথি পুনরায় আইনগতভাবে পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। অন্যদিকে আপিল না হলে কিংবা উচ্চ আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হবে।
এই মামলায় আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে সাক্ষ্যপ্রমাণের পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কীভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, মামলার রায়ে সেটিও প্রতিফলিত হয়েছে।