জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির একটি অংশ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। মামলার অন্যতম আসামি ওবায়দুল কাদেরও একই সাজা পেয়েছেন।
মামলার রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী, বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সময়কালে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা সংশ্লিষ্ট কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোর পর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এই মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। মামলাটি প্রথমে ৫/২০২৫ মিস কেস হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৮ জুন মামলার তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ওই অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট নয়টি অভিযোগ আনা হয়।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণের দিনই ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার আদেশ দেওয়া হয়।
মামলার বিচারপর্বে প্রসিকিউশন পক্ষ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ এবং সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শুরু হয়। একই দিন থেকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণও শুরু হয়।
প্রসিকিউশন পক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ২৯ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে। তাদের সাক্ষ্য ও জবানবন্দি গ্রহণের পাশাপাশি মামলার অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২ আগস্ট। এরপর ৪ আগস্ট থেকে মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর ১৭ আগস্ট শুনানি শেষ হয়।
সেদিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর নির্ধারিত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সাত আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হলো।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি মামলার রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। পাঁচ আসামির মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী, এসব সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে মামলার রায় শুধু অভিযুক্তদের শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রায়ের অংশ হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা এই মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। মামলায় আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্কের পর ট্রাইব্যুনাল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। রায়ে সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি পাঁচজনের সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও সুযোগের বিষয়গুলো প্রযোজ্য হবে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর মামলাটি এখন পরবর্তী আইনগত ধাপের দিকে এগোবে।
জুলাই বিপ্লবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে এই রায় দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশের কারণে রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভুক্তভোগীদের জন্য প্রতিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ।