প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মা দিবস। মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে আবেগঘন বার্তায়। কিন্তু এই উৎসবের আবহে আমরা কি একবারও ভেবে দেখি সেইসব ‘নতুন মা’য়েদের কথা, যারা মাতৃত্বের নতুন অভিজ্ঞতায় হিমশিম খাচ্ছেন? সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক জগতে যে বিশাল ওলটপালট ঘটে, তার খবর রাখার প্রয়োজনীয়তা এবার মা দিবসের মূল আলোচনায় উঠে এসেছে।
ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত
একটি নবজাতকের আগমনে পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে শিশুর যত্ন নিয়ে। কিন্তু এই আনন্দোৎসবের কেন্দ্রে থাকা মা অনেক সময় একাকীত্ব বা মানসিক চাপে ভোগেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘বেবি ব্লুজ’ বা আরও গুরুতর পর্যায়ে ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’ (প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা)। সমীক্ষা বলছে, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রায় ৮০ শতাংশ মা সাময়িকভাবে বিষণ্নতায় ভোগেন এবং ১৫-২০ শতাংশ মা গুরুতর ডিপ্রেশনের শিকার হন।
নতুন মায়েদের এই মানসিক অবস্থার লক্ষণগুলো অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে না। অকারণে কান্না করা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, সন্তানের সাথে আত্মিক টান অনুভব না করা কিংবা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা—এসবই মানসিক সমস্যার সংকেত। আমাদের সমাজে অনেক সময় এগুলোকে ‘অজুহাত’ বা ‘নতুন মায়ের আদিখ্যেতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মা দিবসের প্রকৃত সার্থকতা কেবল দামি উপহার বা রেস্তোরাঁর খাবারে নয়, বরং মায়ের মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করার মধ্যে নিহিত। একজন নতুন মায়ের পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজন মানসিকভাবে হালকা হওয়ার সুযোগ। বাড়ির ছোট ছোট কাজ বা শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব ভাগ করে নিলে একজন মা নিজের জন্য কিছুটা সময় পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন মায়েদের ওপর ‘নিখুঁত মা’ হওয়ার যে সামাজিক চাপ থাকে, তা থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া জরুরি। তাকে এটা বোঝানো প্রয়োজন যে, সব কাজ একা করতে না পারাটা কোনো ব্যর্থতা নয়। এই ছোট ছোট আশ্বাসের বাণী একজন মাকে ডিপ্রেশনের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
একজন মা সুস্থ থাকলেই একটি শিশু সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে। তাই মা দিবসের এই ক্ষণে চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—গর্ভাবস্থা ও প্রসব পরবর্তী সময়ে নিয়মিত কাউন্সিলিং। যদি দেখা যায় নতুন মা দীর্ঘ সময় ধরে হতাশায় ভুগছেন বা দৈনন্দিন কাজে অনীহা দেখাচ্ছেন, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, মাতৃত্ব কোনো একার সংগ্রাম নয়, এটি একটি সম্মিলিত যাত্রা। এবারের মা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—মায়ের শুধু শারীরিক যত্ন নয়, আমরা তার মনের খবরও রাখব। পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।