রূপালী ব্যাংকের নিলামে বেক্সিমকোর প্রায় ২৬ একর জমি, পাওনা ১৯১ কোটি টাকা - Uttorpatro TV

রূপালী ব্যাংকের নিলামে বেক্সিমকোর প্রায় ২৬ একর জমি, পাওনা ১৯১ কোটি টাকা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 16, 2026

খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্যোগ হিসেবে বেক্সিমকো টেক্সটাইলের বন্ধক রাখা বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকটির কাছে প্রতিষ্ঠানটির পাওনা প্রায় ১৯১ কোটি টাকা। এই অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বন্ধক রাখা মোট ২৫ দশমিক ৯৬ একর জমি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশিত নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বেক্সিমকো টেক্সটাইলের কাছ থেকে ব্যাংকের পাওনা ১৯০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তবে এ হিসাবের মধ্যে অনাদায়ী সুদের অর্থ ধরা হয়নি। ব্যাংকের মূল পাওনার পাশাপাশি অন্যান্য ব্যয় ও আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী প্রযোজ্য সুদ আদায়ের লক্ষ্যেও বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ঋণগ্রহীতা হিসেবে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড বা বেক্সিমকো লিমিটেডের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে বেক্সটেক্স লিমিটেড নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে পদ্মা টেক্সটাইল মিলস ও বেক্সিমকো নিটিংয়ের সঙ্গে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে বর্তমান কাঠামো তৈরি হয়।

নিলামের আওতায় থাকা সম্পত্তির বড় অংশ রয়েছে গাজীপুরে। জেলার জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার জমি বিজ্ঞপ্তিতে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো তফসিলে জমির পরিমাণ একরে, আবার কোথাও শতাংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি তফসিলে ২ দশমিক ১৯ একর, অন্য একটি তফসিলে ৪৮ শতাংশ এবং আরেকটিতে ৩ দশমিক ৬৬ একর জমির বিবরণ রয়েছে।

এ ছাড়া গাজীপুরের সরাবো মৌজা এলাকায় আরও বড় একটি সম্পত্তির তফসিল দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন সিএস খতিয়ানের একাধিক দাগে মোট ৮ দশমিক ৫৫ একর জমির উল্লেখ রয়েছে। এসব সম্পত্তিই ব্যাংকের পাওনা আদায়ের জন্য নিলাম প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জেও বেক্সিমকোর বন্ধক রাখা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি নিলামের তালিকায় রয়েছে। জেলার তারাবো ও যাত্রামুড়া মৌজায় থাকা সম্পত্তির মধ্যে তারাবোর দুটি অংশে মোট ৮ দশমিক ৩৯ একর জমির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এর একটি অংশে ৪ দশমিক ৫২ একর এবং অন্য অংশে ৩ দশমিক ৮৭ একর জমি রয়েছে।

অন্যদিকে, যাত্রামুড়া মৌজার একটি তফসিলে আরও ৯ দশমিক ২ একর জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শুধু এই তিনটি তফসিলেই নারায়ণগঞ্জে নিলামের আওতায় থাকা জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৪১ একর। গাজীপুরের ৮ দশমিক ৫৫ একর জমিসহ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২৬ একর।

নিলামে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র জমা দিতে হবে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার মধ্যে নির্ধারিত কার্যালয়ে দরপত্র পৌঁছাতে হবে। একই দিন দুপুর ২টা ৫ মিনিটে দরপত্রদাতাদের উপস্থিতিতে প্রস্তাবগুলো খোলা হবে।

নিলামে অংশগ্রহণকারীদের প্রস্তাবিত দরের ভিত্তিতে নির্ধারিত হারে জামানত জমা দিতে হবে। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দর প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ, ১০ লাখের বেশি থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত দর হলে ১৫ শতাংশ এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি দর প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে জামানত দেওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছে।

তবে নিলামে কোনো সম্পত্তির জন্য প্রস্তাবিত দর যদি কর্তৃপক্ষের কাছে অস্বাভাবিকভাবে কম বা অপর্যাপ্ত বলে মনে হয়, তাহলে সেই দরপত্র গ্রহণ না করার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, সম্পত্তির বাজারমূল্য ও ব্যাংকের পাওনা বিবেচনায় নিয়ে নিলামের ফলাফল চূড়ান্ত করার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

বেক্সিমকোর আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের একটি বড় অংশ রূপালী ব্যাংকের কাছে ছিল। ওই সময় রূপালী ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৪৮২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে বর্তমান নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে যে ১৯০ কোটি ৯২ লাখ টাকা পাওনার কথা বলা হয়েছে, নিলাম প্রক্রিয়ায় মূলত সেই দাবিকেই ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।

এদিকে নিলাম সম্পর্কে বেক্সিমকো লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি আসাদ উল্লাহ বলেন, তিনি রূপালী ব্যাংকের এই নিলাম বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে অবগত নন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে ব্যবসা থেকে আয় না হওয়ায় ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপি ছিল না। পরবর্তী সময়ে কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানির উৎপাদন ও ব্যবসা বন্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম না থাকায় সম্পদও কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নিলামের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নিলামের মাধ্যমে সম্পত্তির প্রকৃত বা প্রত্যাশিত মূল্য পাওয়া যাবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মতে, ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ থাকলে সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে।

রূপালী ব্যাংকের এই উদ্যোগ দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় ১৯১ কোটি টাকা পাওনা আদায়ে বেক্সিমকোর বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে তোলার সিদ্ধান্তের ফলে এখন নজর থাকবে নিলাম প্রক্রিয়া, দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত সম্পত্তিগুলোর বিক্রয়মূল্যের ওপর।