শিক্ষকতা, রাজনীতি, পৌরসভার চেয়ারম্যান: রাজনীতির বর্ণাঢ্য পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির আসনে ফখরুল - Uttorpatro TV

শিক্ষকতা, রাজনীতি, পৌরসভার চেয়ারম্যান: রাজনীতির বর্ণাঢ্য পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির আসনে ফখরুল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 14, 2026

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা ও একাধিক সংগ্রামের প্রতীক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে তাঁকে এই সর্বোচ্চ পদে মনোনীত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সব প্রক্রিয়া শেষে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে তাঁর আসন গ্রহণ করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরই মধ্যে তিনি দলীয় মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে আগামী ২০ আগস্ট তিনি নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন এবং বঙ্গভবনে উঠবেন।

ছাত্ররাজনীতি ও গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলো

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় এক অভিজাত রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন একাধিকবার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তাঁর রাজনীতির সূত্রপাত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে শুরু করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তৎকালীন সরকারের আমলে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।

বিসিএস ক্যাডার থেকে শিক্ষকতা ও সরকারি দায়িত্ব

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৮২ সালে পুনরায় শিক্ষকতায় ফিরলেও ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে কর্মরত অবস্থায় শিক্ষা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনে দায়িত্ব পালন করেন।

পৌর চেয়ারম্যান থেকে মন্ত্রিত্ব ও বিএনপির কান্ডারি

১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন মির্জা ফখরুল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরবর্তীতে জাতীয় কৃষক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন বিএনপি সরকারে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে দলের ষষ্ঠ ও পরবর্তী সম্মেলনগুলোতে জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১১ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব পদে দায়িত্ব পান। দীর্ঘ সংগ্রাম, গ্রেপ্তার ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিএনপিকে সংগঠিত রাখতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুন গঠিত সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন তিনি।

পরিবার ও জন্মভূমির অনুভূতি

ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যার জনক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম একজন সাবেক বিমা কর্মকর্তা। জ্যেষ্ঠ কন্যা মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত এবং ছোট কন্যা মির্জা সাফারুহ ঢাকায় শিক্ষকতা করছেন।

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি মনোনীত হওয়ার খবর শুনে তাঁর জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ে নেমে এসেছে আনন্দের বন্যা। তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে প্রকাশ করেছেন মিশ্র অনুভূতি। তিনি বলেন, “ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া আমাদের জেলা ও দেশবাসীর জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়। তবে ঠাকুরগাঁওবাসী হয়তো আগের মতো তাঁর সরাসরি সাহচর্য পাবে না। তবে আমরা আশাবাদী, তাঁর প্রজ্ঞা ও দৃষ্টিভঙ্গি পুরো দেশকে নতুন গতি দেবে।” ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরাও এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত এবং তাঁর সফল মেয়াদ কামনা করছেন।