গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির দেশ: অটোরিকশা ও এলএনজি টার্মিনালকে দায়ী করলেন মন্ত্রী - Uttorpatro TV

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির দেশ: অটোরিকশা ও এলএনজি টার্মিনালকে দায়ী করলেন মন্ত্রী

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 14, 2026

সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের যৌথ থাবায় স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের স্বাভাবিক জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও গ্রাম পর্যায়—সর্বত্রই এখন জ্বালানি ও বিদ্যুতের জন্য হাহাকার। বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন রান্না বন্ধ, যানবাহনে গ্যাসের অভাব এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ধস নামায় গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। ফলে অর্ধেকের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে উৎপাদনে যেতে পারছে না। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশজুড়ে দৈনিক প্রায় ৩,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা ও এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার অজুহাত

বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাম্প্রতিক এই সংকটকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান। তিনি দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ সংকটের জন্য ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, গভীর রাতে একসাথে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।

এ ছাড়া ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে পড়ার কারণে বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, নতুন করে গ্যাস উত্তোলন কিংবা এলএনজি সরবরাহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ছাড়া বড় কোনো বিকল্প নেই। এই পরিস্থিতিতে তিনি দেশবাসীকে কিছুটা ধৈর্য ধরার বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন।

ধস নেমেছে শিল্প ও সার উৎপাদনে

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দেশের শিল্প খাতে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং ও নিটিং কারখানাগুলোতে কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণ থমকে গেছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্যমতে, তাদের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৭০ শতাংশ কারখানা দৈনিক উৎপাদন বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে, যার ফলে বৈশ্বিক বাজার ও রপ্তানি চুক্তি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে সার কারখানাগুলোতে চাহিদার মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে দেশের অন্যতম প্রধান ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (এএফসিসিএল) উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে কারখানাটি সচল না থাকলেও বিশাল অঙ্কের লোকসান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

জেলা পর্যায় ও গ্রামীণ জীবনের করুণ চিত্র

গ্যাস উত্তোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই এখন দেখা দিয়েছে চরম গ্যাসে সংকট। বাসাবাড়িতে দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ প্রাচীন পদ্ধতির মাটির চুলা বা অতিরিক্ত খরচ করে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভর করছেন।

অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা গেছে কুমিল্লা নগরীতেও। টানা ৩২ থেকে ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সেখানে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। স্থানীয় হোটেলগুলোতে খাদ্যের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেলেও সেখানেও রান্নার জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।

গ্রামীণ জনপদের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক। সুনামগঞ্জসহ দেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোর গ্রামগুলোতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বয়স্করা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন। কোথাও কোথাও ক্ষুব্ধ অধিবাসীরা বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করার দাবিতে সড়কে মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন।

উত্তরণের উপায় ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সংকট সামাল দিতে সাময়িকভাবে শিল্প খাতের গ্যাস কেটে বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো হলেও লোডশেডিং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মোংলা ও অন্যান্য পয়েন্টে অতিরিক্ত এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে। তবে কার্যকর সমাধান না আসা পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি কমছে না।