সরকারি হাসপাতালে ৫১% এক্স-রে ও ইমেজিং যন্ত্র অকেজো: চরম ভোগান্তিতে রোগীরা, পিপিআরসির চাঞ্চল্যকর তথ্য - Uttorpatro TV সরকারি হাসপাতালে ৫০% ইমেজিং যন্ত্র অকেজো, সেবায় চরম সংকট | পিপিআরসি গবেষণা

সরকারি হাসপাতালে ৫১% এক্স-রে ও ইমেজিং যন্ত্র অকেজো: চরম ভোগান্তিতে রোগীরা, পিপিআরসির চাঞ্চল্যকর তথ্য

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 30, 2026

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগনির্ণয়ের আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জেলা হাসপাতালগুলোতে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইমেজিং সেবার প্রাপ্যতা কাগজে-কলমে ৮৫ শতাংশ দেখালেও বাস্তবে এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে নিয়মিতভাবে এসব সেবা চালু ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ সময়।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর এক সাম্প্রতিক জরিপে এই আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জেলা, উপজেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের ওপর এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এসব হাসপাতালে থাকা মোট রোগনির্ণয় বা রেডিও ইমেজিং যন্ত্রের প্রায় ৫২ শতাংশই গত এক বছরে কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়নি।

যন্ত্রপাতি অকেজো থাকা, টেকনিশিয়ান বা দক্ষ জনবলের অভাব এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণেই কোটি কোটি টাকা মূল্যের এসব সরঞ্জাম অলস পড়ে থাকছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীরা সরকারি হাসপাতালে এসে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অতিরিক্ত খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।

গবেষণায় কেবল ইমেজিং সেবার সংকটই নয়, সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ও জরুরি ওষুধের তীব্র স্বল্পতার কথা বলা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশই বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। ফলে চিকিৎসার জন্য তাদের নিজস্ব পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage) নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা।

সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ গবেষক দল এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডা. হোসেন জিল্লুর রহমান। গবেষণা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।

গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনকালে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারি স্বাস্থ্য খাতে সম্পদের অপ্রতুলতার চেয়েও বড় সমস্যা হলো সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব ও বাজেট ব্যবহারে অদক্ষতা। সেবা নিশ্চিত করতে কেবল নতুন যন্ত্রপাতি কেনাই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলো সচল রাখা, দক্ষ জনবল পদায়ন এবং ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নে পিপিআরসি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রদান করেছে:

  • অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির নিয়মিত অডিট: কতগুলো যন্ত্র সচল ও কতগুলো অকেজো, তার নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা।

  • দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা: যন্ত্র নষ্ট হলে দ্রুত মেরামতের জন্য কেন্দ্রীয় বিকেন্দ্রীভূত তহবিল গঠন।

  • দক্ষ জনবল নিয়োগ: এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন।

  • ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ: জরুরি ওষুধের মজুত বাড়াতে বাজেট বরাদ্দ ও সঠিক বণ্টন প্রক্রিয়া চালু করা।

সরকারি হাসপাতালের এই সংকট দূর করতে দ্রুত নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ব্যয় আরও বাড়বে এবং স্বাস্থ্য খাতের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।