বাংলাদেশের সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে গুরুতর অভিযোগ জমা পড়েছে। আজ রোববার ‘বাংলাদেশ আজাদি পার্টি’ ও ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম’ নামের দুটি পৃথক সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব আবেদন করা হয়। গুম, খুন, শাপলা চত্বরের ঘটনা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে নীরব ভূমিকা রাখা ও ফ্যাসিস্ট সরকারকে আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগে তাঁদের বিচারের দাবি জানানো হয়েছে।
আজাদি পার্টির পক্ষ থেকে জমা দেওয়া অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন—উভয়কেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ দাখিল শেষে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দলটির আহ্বায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. হাসিনুর রহমান। তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে অসংখ্য মানুষকে হত্যা ও গুম করা হলেও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তৎকালীন দুই রাষ্ট্রপতির কেউই এর কোনো প্রতিবাদ জানাননি। এই নীরবতার মধ্য দিয়ে মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোতে তাঁদের মৌন সম্মতি ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়।
একই প্রসঙ্গে দলটির প্রধান সংগঠক মুন্সি বোরهان মাহমুদ জোর দিয়ে বলেন, পিলখানার নির্মম হত্যাযজ্ঞ, শাপলা চত্বরের ঘটনা, একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, তথাকথিত ‘আয়নাঘর’-এ গুম ও অমানবিক নির্যাতনের সময়কালে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে ছিলেন এই দুজন। তৎকালীন ক্ষমতার অংশ হিসেবে তাঁরা শুধু সুবিধা ভোগ করেননি, বরং ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাকে টিকে থাকতে সর্বাত্মক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। ফলে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের আইনি ও নৈতিক দায় সাবেক এই দুই রাষ্ট্রপ্রধান কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
অন্যদিকে, ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম’ নামক অপর সংগঠনটি কেবল সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেশ করেছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস নিজেই ভুক্তভোগী হিসেবে তাঁর অভিযোগে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন।
অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে শাহবাগে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে আল নূর মোহাম্মদকে গুমের শিকার হতে হয়। গত বছরের ১৮ জানুয়ারি রাতে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রাজধানীর মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় গুম রাখার পর পরদিন ১৯ জানুয়ারি বাংলামোটর এলাকায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়।
রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘একান্ত সহযোগী’ হিসেবে সাহাবুদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সাধারণ শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের ওপর গুলিবর্ষণ, নির্যাতন এবং গুম-খুনের নির্দেশদাতা হিসেবে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কী ভূমিকা ছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচন করতে হবে। সেই সঙ্গে ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন ও সামগ্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সাহাবুদ্দিনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানানো হয়।
সাবেক দুই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে একই দিনে দুটি পৃথক অভিযোগ জমা পড়ার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে, উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তিনি এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।