প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যু: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল দিল্লি, ভিডিও দেখতে নারাজ প্রধান বিচারপতি - Uttorpatro TV দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের হামলা, জরুরি শুনানিতে রাজি নয় সুপ্রিম কোর্ট

প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যু: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল দিল্লি, ভিডিও দেখতে নারাজ প্রধান বিচারপতি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 22, 2026
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ছবি: এএনআই

বিশেষ প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ভারতে কেন্দ্রীয় স্তরে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নানা অনিয়মের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। এই ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের তরুণদের একটি নতুন সংগঠন। তবে যন্তর মন্তর ও সংসদ ভবনের অভিমুখে আন্দোলনকারীদের ওপর দিল্লি পুলিশের দফায় দফায় কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং প্লাস্টিক ব্যাটনের আঘাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

পুলিশের এই নজিরবিহীন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেও তাৎক্ষণিক কোনো স্বস্তি মেলেনি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আজ বুধবার ওই ঘটনার ওপর জরুরি শুনানির আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনটি তুলে ধরেছিলেন তাঁদের এক আইনজীবী। তিনি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে জানান, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ কতটা বর্বর আচরণ করেছে, তার স্পষ্ট ভিডিও প্রমাণ তাঁদের হাতে রয়েছে। আইনজীবী আদালতকে সেই ভিডিও ফুটেজ দেখার বিনীত অনুরোধ জানান।

তবে এই আবেদনের জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করে বলেন, “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না এবং নিজের সময়ও নষ্ট করবেন না।” তিনি আরও মন্তব্য করেন, “ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই।” আইনজীবী আবারও চেষ্টা করে বলেন, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি তাঁর বক্তব্যে বাধা দিয়ে সংক্ষেপে বলেন, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”

উল্লেখ্য, এর আগের দিন মঙ্গলবার দিল্লি হাইকোর্টও একই ধরনের একটি আবেদনের জরুরি শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মন্তব্য করেছিল, “আদালতকে এর মধ্যে টানবেন না।” দুই আদালতের এই অবস্থানে হতাশ হয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্যঙ্গাত্মক নামে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। এই অদ্ভুত নামের পেছনে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টেরই একটি মন্তব্য।

কয়েক মাস আগে একটি শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশের বেকার ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) এবং ‘পরজীবী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এই অপমানজনক মন্তব্যকে প্রতিবাদ হিসেবে গ্রহণ করেন অভিজিৎ দীপ নামের এক তরুণ। তিনি শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের অনুকরণে ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং অনুসারীর সংখ্যায় বিজেপিকেও ছাড়িয়ে যায়।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো হলো—

  • জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতামূলক ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরিচালনা।

  • বিতর্কিত ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ (NTA)-এর আমূল সংস্কার।

  • প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যর্থতার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ।

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবিতে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। বিরোধীদের উপস্থিতিতে এটি এখন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। লাদাখের প্রখ্যাত পরিবেশবাদী কর্মী সোনম ওয়াংচুকের ছবি হাতে অনেক তরুণীকেও যন্তর মন্তরের অবস্থানে যোগ দিতে দেখা গেছে।

ভারতের সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর সোমবার থেকে আন্দোলন রূপ নেয় মহা-পদযাত্রায়। সংসদ অভিমুখে শিক্ষার্থীরা এগোতে থাকলে পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে যায়। এরপরই নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, রাজপথে তরুণ-তরুণীদের তাড়া করে লাঠিপেটা করছে পুলিশ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মোদি সরকার সংসদের চলতি অধিবেশনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল কোনো বড় বিতর্ক ছাড়াই পাস করিয়ে নিতে চায়। সাধারণ মানুষের নজর সংসদের ভেতরের আলোচনা থেকে অন্যদিকে ঘোরাতেই আন্দোলনকে কিছুটা বাড়তে দেওয়া হচ্ছে কি না— তা নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। তবে এই ছাত্র আন্দোলন বর্তমানে সরকারের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে। আপাতত যন্তর মন্তরে অবস্থান ধর্মঘট বজায় রেখেছে ককরোচ জনতা পার্টি এবং রাজপথের এই লড়াই সহসা থামছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।