পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর বেশ কিছু প্রশাসনিক নির্দেশিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা তথা ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ অর্জুন সিংয়ের একটি সাম্প্রতিক দাবিকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছে নতুন বিতর্ক। তাঁর দাবি অনুযায়ী, রাজ্যে জনপথ বা রাস্তায় নামাজ আদায়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
সম্প্রতি ‘ইন্ডিয়া টুডে টিভি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্জুন সিং দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে এখন থেকে রাস্তায় নামাজ পড়া বরদাস্ত করা হবে না। অর্জুন সিংয়ের কথায়, “মসজিদে নামাজ পড়তে কোনো বাধা নেই, তবে জনভোগান্তি তৈরি করে রাস্তায় তা করা যাবে না।” এছাড়া তিনি আরও উল্লেখ করেন যে গরু পাচার, চোরাচালান এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো অপরাধ দমনেও সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও বিজেপির বিভিন্ন শীর্ষ নেতাদের গলায় রাস্তা আটকে ধর্মীয় আচার পালনের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে দেখা গিয়েছে। গত বছর কলকাতার রেড রোডে ঈদের নামাজ আয়োজনের অনুমতি নিয়ে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়।
গত ১১ মে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের পর জেলাশাসক ও পুলিশ প্রশাসনকে একগুচ্ছ মৌখিক ও নির্বাহী আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতের সংবিধানের ৭৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বা রাজ্য সরকার প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে এ ধরনের নির্বাহী আদেশ বা ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ জারি করতে পারেন। তবে এ ধরনের অনেক নির্দেশনার লিখিত কপি সবসময় জনসমক্ষে আনা হয় না।
তবে অর্জুন সিংয়ের এই দাবি নিয়ে খোদ প্রশাসনের অন্দরমহলে ভিন্ন মত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, প্রশাসন থেকে বিভিন্ন শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হলেও সেখানে নির্দিষ্ট করে কোনো ধর্মীয় আচার বা ‘নামাজ’ বন্ধ করার কথা সরাসরি উল্লেখ নেই। মূলত জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ছিল এসব নির্দেশের মূল উদ্দেশ্য।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন অল ইন্ডিয়া হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ আবদুল সেলিম। তিনি জানান, জনস্বার্থে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বা খোলা জায়গায় মাংস বিক্রি বন্ধের মতো সিদ্ধান্তগুলো ইতিবাচক ও সমর্থনযোগ্য। তবে ধর্মীয় আচার পালনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে যেমন অনেকে এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে শৃঙ্খলা রক্ষার পথে বড় পদক্ষেপ বলছেন, অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নেও অনেকে সরব হয়েছেন।