হতদরিদ্রের সরকারি সাইকেল নাতনিকে উপহার! সমালোচনার মুখে ফেরত দিলেন জামায়াত নেতা তাজুল - Uttorpatro TV ঝিনাইদহে হতদরিদ্রের সরকারি সাইকেল নাতনিকে দিলেন জামায়াত নেতা

হতদরিদ্রের সরকারি সাইকেল নাতনিকে উপহার! সমালোচনার মুখে ফেরত দিলেন জামায়াত নেতা তাজুল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 2, 2026
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে সরকারি বরাদ্দের সাইকেল নিজে স্বাক্ষর করে গ্রহণ করার পর নিজের নাতনিকে দেন জামায়াত নেতা তাজুল ইসলাম। পরে সাইকেলটি ফেরত দেওয়া হয় ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

সরকারি সহায়তার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও হতদরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু সেই বরাদ্দের অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায়। দরিদ্র পরিবারের এক মাদ্রাসাছাত্রের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি বাইসাইকেল নিজের নাতনিকে উপহার দিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন উপজেলা জামায়াতের আমির ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম।

গতকাল বুধবার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় প্রাঙ্গণে এই সাইকেল বিতরণের সময় ঘটনাটি ঘটে। তবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে দুপুরে সাইকেলটি ফেরত দিতে বাধ্য হন ওই জামায়াত নেতা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোটচাঁদপুর উপজেলার হতদরিদ্র ও দুস্থ ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং সহায়তার জন্য বিভিন্ন সামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে ইউএনওর উপস্থিতিতে ২৪টি বাইসাইকেল, ছাগল, কৃষি কাজের জন্য স্প্রে মেশিন, সেলাই মেশিন, যুবকদের জন্য ফুটবল এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, বিতরণ তালিকায় থাকা এক দরিদ্র মাদ্রাসাছাত্রের নাম ব্যবহার করে একটি বাইসাইকেল নিজের কবজায় নেন জামায়াত নেতা তাজুল ইসলাম। তিনি নিজেই সরকারি নথিতে স্বাক্ষর করে সাইকেলটি গ্রহণ করেন। তবে সেটি কোনো প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে তুলে না দিয়ে, সরাসরি নিজের নাতনি মারিয়ার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেন।

সরকারি বরাদ্দের সাইকেল জামায়াত নেতার নাতনিকে দেওয়ার বিষয়টি উপস্থিত স্থানীয় সাধারণ মানুষের নজরে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাজুল ইসলামের সাইকেল গ্রহণের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে স্বাক্ষর করে সাইকেলটি নিচ্ছেন এবং পরবর্তীতে তা নাতনির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার সাথে সাথে স্থানীয় সচেতন মহল ও নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার এমন আচরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। অনেকেই মন্তব্য করেন, যেখানে প্রকৃত গরিব মানুষ যাতায়াতের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে, সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি মাল নিজের পরিবারে নেওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক।

বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ও সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করলে তা ঝিনাইদহ-৩ আসনের জামায়াত-দলীয় সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমানের নজরে আসে। দলের সিনিয়র নেতার এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর সরাসরি হস্তক্ষেপে দুপুরের মধ্যেই নাতনির কাছ থেকে সাইকেলটি উদ্ধার করে পুনরায় ইউএনও কার্যালয়ে ফেরত পাঠান তাজুল ইসলাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা তাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তবে নিজের কাজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার ছেলে বর্তমানে বেকার এবং বেশ কিছুদিন ধরে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক এই অভাবের কথা চিন্তা করেই সাইকেলটি আমি আমার নাতনি মারিয়াকে দিয়েছিলাম। তবে বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠায় এবং ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় আমি সাইকেলটি ফেরত দিয়েছি।”

কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “সরকারি বাইসাইকেল বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের একটি অভিযোগ আমাদের সামনে এসেছিল। বিষয়টি জানার পর এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সাইকেলটি ফেরত এনেছি।” তিনি আরও জানান, ফেরত আনা বাইসাইকেলটি পরবর্তীতে সুমাইয়া খাতুন নামের একজন প্রকৃত ও যোগ্য উপকারভোগী ছাত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন সব সময় স্বচ্ছতার সাথে সরকারি বরাদ্দ বিতরণ করতে বদ্ধপরিকর।

এই ঘটনার পর কোটচাঁদপুর এলাকায় রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো গুঞ্জন চলছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি সামগ্রী যেন প্রকৃত দুস্থদের মাঝেই বিতরণ করা হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।