জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার অধিবেশনে দলটির আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনেছবি: জামায়াতে ইসলামীর সৌজন্যে

দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের সুযোগ বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার হাতছাড়া করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া গণভোটের রায়কে বর্তমান সরকারি দল উপেক্ষা করেছে, যার ফলে গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় সংস্কার থমকে গেছে। আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির তাঁর ভাষণে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সীমান্ত সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আফসোস! বর্তমান সরকারি দল বিশাল জনমতের এই রায়কে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করল। ফলে আমরা যেখানে ছিলাম, ঠিক সেখানেই আটকে রইলাম। শাসনব্যবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন আসল না।”
ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী ধারার অবসান ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই সংস্কারের সনদ তৈরি করা হয়েছিল এবং তার ওপর ভিত্তি করেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সরকার কেবল সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে মূল্যায়ন করেছে, কিন্তু গণভোটের রায়কে কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
সরকারের চার মাসের মেয়াদকাল নিয়ে চলমান আলোচনার জবাবে তিনি বলেন, “হয়তো কেউ কেউ যুক্তি দেবেন যে মাত্র চার মাসের সরকার, আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করা উচিত। কিন্তু একটি রাষ্ট্র বা দেশ চলে তার ভিত্তির (ফাউন্ডেশন) ওপর। ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’—সকাল দেখলেই বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে। নির্বাচনের আগে সরকারি ও বিরোধী দল—উভয়েই গণভোটের ফল মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্দলীয় সরকারের অধীনে হওয়া এই গণভোটের রায় উপেক্ষা করে জাতীয় জীবনে নতুন সংকট তৈরি করা হয়েছে।”
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, স্বাধীন গুম কমিশন এবং একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের মতো মৌলিক সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ সরকার নেয়নি। যার ফলে যে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহারের কারণে অতীতে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, সেই জায়গাগুলো আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, সমাজ এখন ভালো নেই। সারা দেশে খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি গাইবান্ধায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেই ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, মন্ত্রী সংসদের ভেতরে সব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু নিজের মন্ত্রণালয়ের দিকে নজর দেওয়ার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট সময় বা সুযোগ তাঁর নেই।
তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, জনগণের স্বার্থে সরকার কোনো ভালো উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল অবশ্যই সহযোগিতা করবে। তবে যেকোনো গণবিরোধী উদ্যোগের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমানতালে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে জামায়াতের এই লড়াই চলবে এবং যেখানেই ফ্যাসিবাদের ছায়া দেখা যাবে, সেখানেই প্রতিরোধ হবে। একই সাথে তিনি দেশবাসীকে অধিকার আদায়ের আন্দোলনের জন্য আরও ত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
দলের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে জামায়াত আমির বলেন, “আমাদের কোনো কার্যক্রম যদি দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী হয়, তবে জনগণ যেন আমাদের ভুল ধরিয়ে দেয়। আমরা জনগণের যেকোনো গঠনমূলক সমালোচনা ও প্রতিবাদকে স্বাগত জানাব।”
সীমান্তে চলমান উত্তেজনা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এক সুতোয় গাঁথা রয়েছে। গোটা দেশবাসী বিজিবির পাশে আছে। মহান আল্লাহর সাহায্য ও সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের বিদেশি আধিপত্যবাদকে রুখে দেওয়া সম্ভব। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দলকে সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সবশেষে তিনি বলেন, ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে দুইবার স্বাধীনতা অর্জন করলেও এ দেশের জনগণের মূল প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। দেশ পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই আজ পর্যন্ত সামাজিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।
উদ্বোধনী এই অধিবেশনে জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান, আ ন ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।