চোখের জল ও কিংবদন্তিদের হাততালি: স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে নেইমারের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন - Uttorpatro TV ব্রাজিল দলে নেইমারের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন: স্কটল্যান্ড ম্যাচে ফিরেই আবেগঘন নেইমার

চোখের জল ও কিংবদন্তিদের হাততালি: স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে নেইমারের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 25, 2026
কাঁদছেন নেইমার রয়টার্স

“দৌড়াও, নিজেকে নিংড়ে দাও। এমনভাবে দৌড়াও, যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ দিন।” — ম্যাচ শুরুর আগে এই একটি কথাই যেন পুরো ব্রাজিল শিবিরের আবহ বদলে দিয়েছিল। কথাটি নেইমার সিনিয়র তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন গত বছর কিংস লিগের ফাইনালে সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করার জন্য। মায়ামিতে স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে নেইমার জুনিয়রের বাবা সেই পুরোনো ভিডিওটি আবারও নিজের ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেন। বাবার এই অনুচ্চারিত বার্তাটি ছেলের জন্য ছিল একদম পরিষ্কার—মাঠে নেমে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে হবে। আর নেইমারও ঠিক সেটাই করলেন। ৩৪ বছর বয়সী এই মহাতারকার জন্য এটি কোনো শেষ ম্যাচ ছিল না, বরং এটি ছিল ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।

২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে মারাত্মক চোট পাওয়ার পর থেকেই জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন নেইমার। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। কোচ কার্লো আনচেলত্তি যখন বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন, তখন পুরো ফুটবলবিশ্বের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—নেইমার কি থাকছেন? আনচেলত্তি সমর্থকদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করেন এবং আগেই জানিয়ে দেন, স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়েই মাঠে ফিরবেন সেলেসাওদের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

অপেক্ষার অবসান ও কুনিয়ার সেই আলিঙ্গন

ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে ফুটবলপ্রেমীদের সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। ৯ নম্বর জার্সিধারী ফরোয়ার্ড মাতেউস কুনিয়া যখন মাঠ থেকে উঠে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর মুখে ছিল এক চিলতে চওড়া হাসি। ১০ নম্বর জার্সি গায়ে যখন নেইমার টাচলাইনে এসে দাঁড়ালেন, কুনিয়া যেন পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি মানুষ হিসেবে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। দীর্ঘ ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে আবারও মাঠে নামলেন নেইমার। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে স্কোয়াডের বাইরে থাকার পর অবশেষে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে উইঙ্গার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আখ্যা দিয়েছেন “আমাদের আইডলের প্রত্যাবর্তন” হিসেবে। মাঠে নামার পর মাত্র ২০ মিনিটের কিছু বেশি সময় পেয়েছিলেন তিনি। এই অল্প সময়ের মধ্যেই কর্নার কিক নেওয়া এবং বেশ কয়েকটি আক্রমণ তৈরি করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের মূল চাবিকাঠি কার হাতে থাকছে।

চোটের পাহাড় পেরিয়ে অঁরির প্রশংসা

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার জুনিগার সেই মারাত্মক ট্যাকল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ক্যারিয়ারে ছয়টি বড় বড় চোটের মুখোমুখি হতে হয়েছে নেইমারকে। সাধারণ কোনো ফুটবলার হলে হয়তো এত দিনে বুটজোড়া তুলে রাখতেন। কিন্তু নেইমার অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি শুধু ফিরেই আসেননি, মাঠে নিজের চেনা ছন্দও দেখিয়েছেন। ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি নেইমারের এই প্রত্যাবর্তন দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেন, “নেইমারের মাঠে নামার মুহূর্তেই ম্যাচটা বদলে গেল। বিশ্বসেরা খেলোয়াড়েরা এমনই হয়। ম্যাচে নিজের প্রভাব রাখতে তাঁদের পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকার প্রয়োজন হয় না।”

গ্যালারিতে তারকার মেলা ও আবেগঘন অশ্রু

মায়ামির এই ম্যাচে নেইমারকে অনুপ্রেরণা দিতে গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন তাঁর কন্যা মাভি এবং মা ব্রুনা বিয়ানকার্দি। ছোট্ট মাভির টি-শার্টে লেখা ছিল “১০০% যিশুর।” শুধু পরিবারই নয়, গ্যালারি আলো করে বসেছিলেন ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নক্ষত্ররা—রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনিও, কাফু এবং রবার্তো কার্লোস। এই কিংবদন্তিদের সামনে ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। তাঁর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

অনেকেই তাঁর ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সমালোচনা করেছিলেন পূর্ণ ফিট না হয়েও কেন তাঁকে দলে রাখা হলো। কিন্তু কোচ আনচেলত্তি সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নেইমারকে তাঁর ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ করে দিয়েছেন। ম্যাচ শেষে শিষ্য সম্পর্কে আনচেলত্তি বলেন, “তার বয়স ৩৪ ছুঁয়েছে, অথচ ফুটবল খেলার প্রতি তার তাড়না ও ভালোবাসা যেন এখনো যেকোনো কিশোরের মতোই।” নিজের ফেরা নিয়ে ভীষণ গর্বিত নেইমার নিজেও বলেন, “জাতীয় দলে ফিরে এই জার্সি গায়ে জড়ানোটাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। ব্রাজিলের জাতীয় দলের জার্সিটা পরতে আমি মনেপ্রাণে ভালোবাসি।” বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন মেসি-এমবাপ্পেরা গোলের উৎসবে মেতেছেন, তখন নেইমারও তাঁর নিজের সেরাটা নিংড়ে দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।