ধানমন্ডিতে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বাসায় শিশু গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু: হত্যার অভিযোগ - Uttorpatro TV ধানমন্ডিতে প্রকৌশলীর বাসায় শিশু গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু | হত্যা নাকি দুর্ঘটনা?

ধানমন্ডিতে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বাসায় শিশু গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু: হত্যার অভিযোগ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 19, 2026
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির একটি বহুতল ভবন থেকে ৯ বছরের এক শিশু গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আজ শুক্রবার সকালে গুরুতর আহত অবস্থায় ওই শিশুকে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত শিশুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিল।

শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, তাকে পরিকল্পিতভাবে ওই বহুতল ভবন থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। তবে ঘটনাটি আসলে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার সাদ্দাম হোসাইন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শিশুটি ধানমন্ডির একটি বহুতল ভবনের দশম তলায় অবস্থিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই কর্মকর্তার বাসায় কাজ করত। পরিবারটিতে গৃহকর্তা, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের দুই সন্তান বসবাস করেন।

শুক্রবার সকালে ওই ফ্ল্যাট থেকে গুরুতর রক্তাক্ত ও আহত অবস্থায় শিশুটিকে জিগাতলার ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) মর্গে পাঠায়।

পুলিশ কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসাইন আরও জানান, গৃহকর্তার পরিবার দাবি করছে মেয়েটি ১০ তলার ছাদে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে মারা গেছে। তবে পুলিশ এখনই এই দাবি চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং প্রাথমিক তদন্তের পরেই মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য নিশ্চিত হওয়া যাবে।

বিকেলে সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে ছুটে আসেন শিশুটির দিনমজুর বাবা-মা। মর্গের সামনে মেয়ের লাশের অপেক্ষায় থাকা এই দম্পতির আহাজারিতে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তারা কোনোভাবেই ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার তত্ত্ব মেনে নিতে রাজি নন। তাদের স্পষ্ট দাবি, মেয়েটিকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে।

নিহত শিশুর বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, কোরবানির ঈদের মাত্র ১৫ দিন আগে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে মাসিক চার হাজার টাকা বেতনে মেয়েটিকে এই বাসায় কাজে দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মেয়েটি সেখানে ভালো ছিল না। কয়েক দিন আগে সে তার মায়ের কাছে ফোনে ভীষণ কান্নাকাটি করে এবং জানায় যে সে আর ওই বাসায় কাজ করতে চায় না। এমনকি গত শুক্রবার ভিডিও কলেও সে তাদের কাছে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আকুতি জানায়।

সন্তানের মুখে কান্নাকাটি শুনে বাবা-মা যখন গৃহকর্তার পরিবারকে মেয়েটিকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন, তখন বাড়িওয়ালির পক্ষ থেকে উল্টো বাধা আসে। তারা দাবি করেন, মেয়েটিকে কাজে দেওয়ার জন্য মধ্যস্থতাকারীকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই ১০ হাজার টাকা ফেরত দিলে তবেই মেয়েকে নিয়ে যেতে দেওয়া হবে।

সবশেষে আজ শুক্রবার সকালে হঠাৎ তাদের ফোনে জানানো হয়, তাদের মেয়ের তীব্র আমাশা হয়েছে এবং সে অত্যন্ত অসুস্থ। খবর পেয়ে তারা দ্রুত ঢাকায় ছুটে এসে মেয়ের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। গৃহকর্তা তখন দাবি করেন মেয়েটি ছাদ থেকে পড়ে গেছে। নিহত শিশুটির বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা (সালনা) থানায়। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়।

ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এই বিষয়ে গৃহকর্তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ধানমন্ডি এলাকায় শিশু গৃহকর্মী মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এই ঘটনাটি রাজধানীর উচ্চবিত্তদের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি আবারও বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর আগে গত বছরের ৩০ আগস্ট ধানমন্ডি থেকে ১২ বছর বয়সী এক গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তারও আগে গত বছরের ২ এপ্রিল পশ্চিম ধানমন্ডির একটি ৯ তলা ভবনের বারান্দা থেকে নিচে পড়ে ১২ বছরের আরও এক শিশু গৃহকর্মীর প্রাণহানি ঘটেছিল। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন ও তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

পুলিশ জানিয়েছে, তারা ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে এবং বাসার লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পেলেই আইনগত পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।