ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর: অভিন্ন নদীর পানির অধিকার নিশ্চিতে নাগরিক সমাজের ১০ দফা দাবি - Uttorpatro TV ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব ও পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি নাগরিক সমাজের

ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর: অভিন্ন নদীর পানির অধিকার নিশ্চিতে নাগরিক সমাজের ১০ দফা দাবি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ২৩, ২০২৬
ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর উপলক্ষে ন্যায্য পানির হিস্যা ও সম্মানজনক সহাবস্থানের দাবিতে ‘নাগরিক সমাজ’-এর মানববন্ধন। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ছবি: প্রথম আলো

ভারতের একতরফা ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো দ্রুত তাদের স্বাভাবিক নাব্যতা হারাচ্ছে। এর ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং সামগ্রিক পরিবেশ আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে একমুখী নীতি পরিহার করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গঙ্গা ও তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধনে দেশের শীর্ষস্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতারা এসব কথা বলেন। ‘নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ন্যায্য পানির অধিকার এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্মানজনক সহাবস্থানের দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে ফারাক্কা বাঁধকে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশের জন্যই একটি ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, এই বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদীগুলো তীব্র পানিশূন্যতায় ভোগে। পদ্মা, মহানন্দা, পুনর্ভবা ও আত্রাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সেচ সংকটের কারণে পরিবেশগত বিপর্যয় তীব্র আকার ধারণ করছে।

শামসুল হুদা আরও উল্লেখ করেন যে, ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাংলাদেশ এখনো তার কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায্য পানির অংশ পাচ্ছে না। তিনি অবিলম্বে আন্তর্জাতিক নদী আইন মেনে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিশ্চিত করার এবং একটি কার্যকরী ও পরিবেশসম্মত নতুন পানি চুক্তি করার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানির অধিকার রক্ষায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১০ দফা দাবি পেশ করা হয়, যার মধ্যে ঐতিহাসিক ১৬ মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবসকে ‘জাতীয় পানি অধিকার দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি অন্যতম।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বলেন, গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার পাওয়া বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে ভারতের কাছ থেকে এই অধিকার আদায়ে সরকারকে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনা আরও জোরদার করতে হবে। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, পানি সংকটের কারণে যে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে, তা এড়াতে সরকারকে অবিলম্বে আন্তরিক ও আন্তর্জাতিক মানের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন তাঁর বক্তব্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এসব বড় বড় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে একক বা একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। যেকোনো প্রকল্প চূড়ান্ত করার আগে দেশের নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের সঙ্গে দীর্ঘ ও উন্মুক্ত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর দখল ও দূষণ রোধে একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান।

উক্ত মানববন্ধনে বনলতা নারী উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টারসহ দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার, পরিবেশবাদী ও ভূমি অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংগঠন সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেয়। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন স্টেপ টুওয়ার্ডসের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি সুলতানা বেগম, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির প্রমুখ।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবাদীদের হাতে ‘নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, সোনার দেশ ফসলে ভরবে’, ‘উজানের বাঁধ, ভাটির কান্না, এই অন্যায় আর না’, এবং ‘ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব নিরূপণে আন্তর্জাতিক কমিশন চাই’ সংবলিত বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন দেখা যায়।