সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের দফায় দফায় পুশইন চেষ্টা: বিজিবির কঠোর প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ, শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন - Uttorpatro TV সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ করল বিজিবি | Border Tension

সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের দফায় দফায় পুশইন চেষ্টা: বিজিবির কঠোর প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ, শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 15, 2026
ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে জোরপূর্বক সাধারণ মানুষকে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নিয়মতান্ত্রিক ও অত্যন্ত কঠোর অবস্থানের কারণে ভারতের এই তৎপরতা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে এখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। বেশ কিছু স্পর্শকাতর পয়েন্টে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ গ্রামবাসীকেও লাঠিসোঁটা হাতে দিনরাত সীমান্ত পাহারা দিতে দেখা গেছে।

বর্তমানে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি ও কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের শূন্যরেখায় (নোম্যান্স ল্যান্ড) নারী ও শিশুসহ অন্তত ২২ জন আটকে রয়েছেন। একাধিক দফায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভারত তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। ফলে খোলা আকাশের নিচে জঙ্গল ও মশার কামড়ে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন তারা।

 কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তে গত শুক্রবার সকালে বিএসএফের পুশইনের শিকার হওয়া ১২ জন মানুষ এখনো নোম্যান্স ল্যান্ডে আটকে আছেন। শনিবার সকালে এ বিষয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। তীব্র শীত, কুয়াশা ও মশার কামড়ে খোলা আকাশের নিচে জঙ্গলঘেরা এই স্থানে ইতিমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আটকে থাকা ব্যক্তিরা।

স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক শহিদ জানান, “আমি শূন্যরেখায় গিয়ে তাদের খোঁজ নিয়েছি। ৪টি শিশুর মধ্যে একটি মারাত্মক জ্বরে ভুগছে। বাকি ৩ শিশুসহ ৪ জন নারী ও ৪ জন পুরুষ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা-কাশিতে আক্রান্ত। গত ১২-১৫ দিন তারা গোসল করতে পারেননি।” বিজিবি ৪৭ ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা জানিয়েছেন, পতাকা বৈঠক হলেও ভারতের অনমনীয় ভাবের কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া রোববার ভোরে চীল্লশপাড়া সীমান্ত দিয়ে আরেকজনকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ভারতে ফেরত পাঠায়।

 জয়পুরহাটের পাঁচবিবির হাটখোলা সীমান্তে এক ভারতীয় বৃদ্ধকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। রোববার সকালে মেইন পিলার ২৭৯ ও সাব পিলার ২৭ এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মাঠে কর্মরত বাংলাদেশি কৃষকদের কাছে ওই বৃদ্ধ নিজেকে ভারতের নাগরিক দাবি করে খাবার ও পানি চাইলে বিষয়টি বিজিবিকে জানানো হয়। পরবর্তীতে বিজিবির নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমান জানান, বিএসএফের পুশইন করা ওই বৃদ্ধকে সফলভাবে পুশব্যাক করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের গয়টাপাড়া ও ভুন্দুর চর এলাকায় পৃথকভাবে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। স্থানীয় শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সোনা মিয়া জানান, নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে সীমান্ত পার করার চেষ্টা করা হলে বিজিবি ও এলাকাবাসী একজোট হয়ে বাধা দেয়। ৩৫ বিজিবির গয়টাপাড়া বিওপির ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পুশইন করা ব্যক্তিদের কোনোভাবেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

 চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা-গেদে সীমান্তের ৭৬-৭৭ নম্বর মেইন পিলারের কাছ দিয়ে রোববার ভোরে ৮ জন পুরুষ ও ৩ জন নারীসহ মোট ১১ জনকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি চুয়াডাঙ্গা-৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং ১১৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সবচেয়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে রাজশাহীর চারঘাট সীমান্তে। গত শুক্রবার রাত থেকে বিএসএফ পদ্মা নদীর ওপারে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরপাড়া থানার কাগমারি চর এলাকায় পুশইনের উদ্দেশ্যে কয়েক শ’ মানুষকে জড়ো করে রেখেছে। এই খবর পাওয়ার পরপরই বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসী একজোট হয়ে টানা তিন দিন ধরে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। বিজিবির চারঘাট বিকল্প বিওপির কমান্ডার সুবেদার দেলোয়ার হোসেন ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার জানান, সীমান্তে টহল ও জনসচেতনতামূলক মাইকিং বাড়ানো হয়েছে।

  ভারত থেকে সম্ভাব্য পুশইনের আশঙ্কায় ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আমজানখোর ইউনিয়নের রত্নাই সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। সেখানে অনুপ্রবেশ রুখতে বিজিবির নিয়মিত টহলের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা লাঠিসোঁটা হাতে বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন। ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আখলাকুর রহমান জানিয়েছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি শতভাগ প্রস্তুত এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে।

সার্বিকভাবে, দেশের প্রতিটি সীমান্তে বিজিবির এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থান ভারতের পুশইন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে শূন্যরেখায় আটকে থাকা মানুষদের মানবিক সংকট নিরসনে দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন সীমান্ত এলাকার সচেতন মহল।