বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তীব্র সমালোচনা করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, জামায়াত মূলত ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি করছে। দেশে যত ধরনের অপকর্ম ও নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে, তার পেছনে জামায়াতে ইসলামী জড়িত থাকলেও সুকৌশলে সেসবের দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিএনপি ও বর্তমান সরকারের ওপর।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশনের ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়।
শামসুজ্জামান দুদু তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সমসাময়িক বাস্তবতা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যতই মিথ্যাচার আর অপপ্রচার চালাক না কেন, তা দিয়ে জনগণের আস্থা ও সমর্থন অর্জন করা সম্ভব হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, দেশের সিংহভাগ মানুষের মূল সমর্থন ও আস্থা এখনো বিএনপির পক্ষেই রয়েছে, তাই কোনো ধরনের সস্তা অপপ্রচারে কোনো লাভ হবে না।
জামায়াতে ইসলামীর অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে বা ক্রান্তিলগ্নে জামায়াত কখনো সঠিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। দেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কারা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল আর কারা পাকিস্তানের বর্বরতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।” তিনি অভিযোগ করেন, তারা মুখে ধর্মের কথা বললেও মূলত ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী ভূমিকা পালন করছে এবং মিথ্যাচার ছাড়া তাদের রাজনীতির আর কোনো ভিত্তি নেই।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের স্বাস্থ্য খাতের তীব্র সমালোচনা করে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে বিগত সরকারকে পাঁচ থেকে ছয়বার লিখিতভাবে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার কারণে দেশ থেকে একসময় সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়া হামের মতো সংক্রামক রোগও আবার ফিরে এসেছে। তবে দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই জরুরি জনস্বাস্থ্য বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
ছবি: জামায়াতের সৌজন্যে
এ সময় দেশের ফার্মাসিস্ট ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। তিনি বলেন, অতীতে দেশের বেশিরভাগ ফার্মেসি রাত ৭টা বা ৮টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু এখন জাতীয় দায়িত্ববোধ ও মানবিক সেবার জায়গা থেকে তারা সারারাত দোকান খোলা রেখে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, অতীতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একক নিয়ন্ত্রণে ছিল, যেখানে শিক্ষার চেয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তি বেশি চলত। বর্তমান সরকার যখন সেখানে প্রকৃত শিক্ষাবিদ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই আরেকটি পক্ষ ক্যাম্পাসগুলোতে কৃত্রিম অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাস স্মরণ করে দুদু বলেন, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে বিএনপি। দলের এমন কোনো ত্যাগী নেতাকর্মী নেই যার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়নি, যাকে জেল খাটতে হয়নি কিংবা নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়নি। এমনকি দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ ছয় বছর বন্দি করে রাখা হয়েছিল।
দলের বর্তমান সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রবাসে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করছেন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে দল পরিচালনা করছেন। এই মুহূর্তে দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে এবং তাঁর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।
দলীয় পরিচয়ে কেউ যেন কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন শামসুজ্জামান দুদু। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যারা সমাজে অপকর্ম, চাঁদাবাজি বা বিশৃঙ্খলা করছে, তারা কোনোভাবেই বিএনপি করতে পারে না। অপরাধীদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না।”
তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, যদি কেউ বিএনপির নাম কিংবা পদবি ব্যবহার করে কোনো ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়, তবে তাকে কোনো ছাড় না দিয়ে অবিলম্বে ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকার আশপাশে কোথাও কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপকর্ম হচ্ছে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখার উদাত্ত আহ্বান জানান।
জাতীয়তাবাদী ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মো. এবি সিদ্দিকী হাওলাদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সুকোমল বড়ুয়া, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।