ড. ইউনূসকে টার্গেট করে মাঠ গরমের কৌশল নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের - Uttorpatro TV নতুন কমিটি ও ঝটিকা মিছিল: কোন কৌশলে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে টার্গেট করে মাঠ গরমের কৌশল নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১৯, ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগ এখন রাজনীতির মাঠে ফেরার জন্য ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। মূল দল ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে নতুন করে কমিটি গঠনের তৎপরতার পাশাপাশি জনমনে প্রভাব ফেলে এমন কিছু সংবেদনশীল ইস্যুকে সামনে এনে তারা মাঠ গরমের চেষ্টা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলটির মূল লক্ষ্য হলো সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং ক্রমান্বয়ে এই ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচিগুলোকে বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ এখন বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে সরাসরি আক্রমণ না করে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার উপদেষ্টামণ্ডলীকে টার্গেট করেছে। হামের টিকার অব্যবস্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বিষয়গুলোকে সামনে এনে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিচারের দাবি তোলা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ড. ইউনূস ও সাবেক উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদনও করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত পেশাজীবী, বিশেষ করে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের একটি অংশকে সামনে রেখে এই আইনি ও প্রচারণামূলক যুদ্ধ চালানো হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর চাপের মুখে থাকা দলটি একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের ধারণা ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা রাজনীতিতে কিছুটা স্পেস বা সুযোগ পাবে। এই নির্বাচনি কৌশলের অংশ হিসেবে দলটির কোনো কোনো নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির পক্ষে ভোটও চেয়েছেন। তবে নির্বাচনের পর তাদের সেই আশা পূরণ হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা করা হলে বিএনপি নেতাকর্মীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের অধ্যাদেশটি বর্তমান নির্বাচিত সরকার হুবহু বহাল রাখায় চরম হতাশ হয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

ছবিঃ সংগৃহীত

৫ আগস্টের ধাক্কার পর আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও তারা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়। দলটির নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সুরক্ষিত অ্যাপস ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখছেন। বিদেশে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা ও উপজেলার তৃণমূল নেতাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা নিয়মিত এসব অনলাইন গ্রুপে যুক্ত হচ্ছেন এবং দল পুনর্গঠনের নির্দেশ দিচ্ছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু অডিও ক্লিপে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা গেছে, যেখানে কমিটি নেই সেখানে দ্রুত কমিটি গঠন করে মাঠে নামতে হবে। তিনি চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন, যদিও তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী একে কেবলই সান্ত্বনা ও কর্মীদের চাঙ্গা রাখার কৌশল হিসেবে দেখছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে গভীর রাতে বা ভোরে ঝটিকা মিছিল করছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এসব মিছিল সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। সম্প্রতি রাজধানী বাড্ডা এলাকায় শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এবং চট্টগ্রামে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজাকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের বড় ধরনের শোডাউন ও স্লোগান দিতে দেখা গেছে। এছাড়া কক্সবাজারের একদল আইনজীবী জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত দল কীভাবে রাজপথে আষ্ফালন দেখানোর সাহস পায়, তা বোধগম্য নয়। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তৎপর হওয়া উচিত।” তিনি আরও মনে করেন, ড. ইউনূস সবসময়ই শেখ হাসিনা ও ভারতের বড় টার্গেট ছিলেন। তাই ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্ব হবে আওয়ামী লীগের বিগত সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসন, গুম-খুন ও অর্থপাচারের ইতিহাস জনগণের সামনে বারবার তুলে ধরে জনসচেতনতা বজায় রাখা।

অন্য এক মন্তব্যে রাজনীতি অধ্যয়নের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে প্রশাসন ও স্থানীয় নেটওয়ার্কে দলটির কিছু প্রভাব রয়ে গেছে। তবে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থান ও জনগণের অসন্তোষের কারণে তাদের প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফেরা কঠিন। তবে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যদি অনৈক্য তৈরি হয়, তবে সেই সুযোগে আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।