পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে মেগা প্রকল্প: ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকার মাইলফলক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। - Uttorpatro TV ৩৩ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ: পুনরুজ্জীবিত হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে মেগা প্রকল্প: ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকার মাইলফলক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১২, ২০২৬
ছবি- উত্তরপত্র টিভি ফাইল ফুটেজ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের স্বপ্নের ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প। দেশের কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজ অনুমোদনের জন্য আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা।

প্রকল্পের পরিধি ও মূল অবকাঠামো

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এই ব্যারেজে ৭৮টি স্পিলওয়ে ও ১৮টি আন্ডার স্লুইস থাকবে। এছাড়া মাছের অবাধ চলাচলের জন্য রাখা হচ্ছে দুটি ফিশ পাস। এই বাঁধের মাধ্যমে নদীতে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে পানির প্রবাহ সচল রাখবে। পাশাপাশি এখান থেকে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে প্রকল্পের আওতায়।

কেন এই ব্যারাজ?

মূলত সত্তরের দশকে ভারতে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট শুরু হয়। প্রবাহ কমে যাওয়ায় গড়াই, মধুমতি, বড়াল ও আড়িয়াল খাঁসহ বেশ কিছু নদী পলি জমে ভরাট হতে শুরু করে। এর ফলে সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও এই প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে কারণ এটি একটি দীর্ঘকালীন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং দেশের অস্তিত্বের সাথে জড়িত। ২০২৬ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ অঞ্চলের পানির সমস্যা সমাধান হবে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য বলছে:

  • বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত হবে।

  • বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর ও বরিশাল অঞ্চলের ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে।

  • ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে প্রায় ২৪ লাখ টন এবং মাছের উৎপাদন বাড়বে ২.৩৪ লাখ টন।

  • সুন্দরবন এলাকায় মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণাক্ততা কমবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে আসবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিশেষজ্ঞ অভিমত

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের আলোচনা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৬১ সালে। পরবর্তীকালে ১৯৯৭ সালে এর স্থান নির্ধারণ করা হয় এবং ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় এটি নিয়ে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে এখন এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে।

পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, “এটি কোনো নতুন ধারণা নয়, বরং অনেক আগেই এটি হওয়া উচিত ছিল। ফারাক্কার প্রভাব মোকাবিলায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির আধার তৈরিতে এই ব্যারাজের কোনো বিকল্প নেই।” তবে বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বিশাল অংকের অর্থায়ন নিশ্চিত করাকে সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি।

আগামী বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পাওয়া যেতে পারে।