বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ভালো সিজিপিএ সাধারণত স্বস্তি, স্বীকৃতি ও ভবিষ্যতের পথচলার প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বাস্তবতা ভিন্ন। সহপাঠী ও শিক্ষকদের প্রশংসা কিংবা পরিবারের আনন্দ থাকলেও, ভালো ফলের পরপরই তাঁদের সামনে ভেসে ওঠে এক বড় প্রশ্ন—পরবর্তী গন্তব্য কোথায়?
শিক্ষার্থীদের মতে, ভালো ফলাফল অর্জন করলেই সব সুযোগের দুয়ার খুলে যায় না। বেসরকারি খাতে আগ্রহ তুলনামূলক কম, আর সরকারি চাকরিতে প্রতিযোগিতা তীব্র। ফলে সাফল্যের পরও অনিশ্চয়তা যেন পিছু ছাড়ে না।
সাফল্যের সঙ্গে সংশয়ের লড়াই
ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আফিয়া আহমেদ স্নাতকে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। তবুও নানা সময় পরিচিতজনদের কাছ থেকে তাঁকে শুনতে হয় এমন মন্তব্য, যা তাঁর অর্জনের গুরুত্বকে খাটো করে। আফিয়া বলেন, ভালো ফলের পরও অনেক সময় মনে হয়—এই সাফল্যের বাস্তব মূল্য কতটুকু? তবে পরিবারের সমর্থন তাঁকে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আফিয়া বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্যদিকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রুবিনা ইয়াসমিন মনে করেন, ভালো ফলাফলের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ৩.৮২ সিজিপিএ পাওয়া এই শিক্ষার্থীর মতে, উচ্চশিক্ষা বা শিক্ষকতায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ফলাফলই প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তিনি জোর দেন দক্ষতা উন্নয়নের ওপর। তাঁর মতে, ভাইভা, প্রেজেন্টেশন ও ব্যবহারিক মূল্যায়ন বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে আরও প্রস্তুত হয়ে উঠবে।
পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর কৌশলই সাফল্যের চাবিকাঠি
মুন্সিগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম সমন্বিত মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। তাঁর সিজিপিএ ৩.৩৯। তিনি মনে করেন, শুধু গাইডবই নয়, মূল বইভিত্তিক পড়াশোনাই শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে।
শফিকুল নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি বিগত কয়েক বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করেছেন, যা তাঁকে পরীক্ষার ধরন বুঝতে সহায়তা করেছে। গণিত ও পরিসংখ্যানের মতো বিষয়গুলো তিনি নিজস্ব নোটের মাধ্যমে সহজ করে নিতেন। খাতার উপস্থাপনা, চিত্র ও গ্রাফ ব্যবহারের দক্ষতাও তাঁকে বাড়তি নম্বর পেতে সাহায্য করেছে।
এই প্রস্তুতির ফল তিনি ইতিমধ্যেই পাচ্ছেন। ২০২৬ সালে দেওয়া তিনটি চাকরির পরীক্ষার মধ্যে দুটি প্রিলিমিনারি পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এতে বিসিএসের লক্ষ্যে তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো ফলাফল যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, তেমনি সামনে এনে দেয় নতুন চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও দক্ষতা অর্জনই হয়ে উঠছে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সে ধরনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত বিসিএসকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরে এগোতে থাকেন। কিন্তু শুধু বিভাগে ভালো ফল করলেই যে সবাই বিসিএসে ভালো করবেন, বিষয়টি তেমনও নয়। তাই এ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য কলেজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য জব প্রিপারেশন ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা হচ্ছে, পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রমকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যেন তাঁরা চাকরির বাজারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে সেখানকার শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ইব্রাহিম আলী, অধ্যক্ষ, রাজশাহী কলেজ