ভালো সিজিপিএর পরও অনিশ্চয়তা—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে কঠিন বাস্তবতা - Uttorpatro TV

ভালো সিজিপিএর পরও অনিশ্চয়তা—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে কঠিন বাস্তবতা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ১৯, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ভালো সিজিপিএ সাধারণত স্বস্তি, স্বীকৃতি ও ভবিষ্যতের পথচলার প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বাস্তবতা ভিন্ন। সহপাঠী ও শিক্ষকদের প্রশংসা কিংবা পরিবারের আনন্দ থাকলেও, ভালো ফলের পরপরই তাঁদের সামনে ভেসে ওঠে এক বড় প্রশ্ন—পরবর্তী গন্তব্য কোথায়?

শিক্ষার্থীদের মতে, ভালো ফলাফল অর্জন করলেই সব সুযোগের দুয়ার খুলে যায় না। বেসরকারি খাতে আগ্রহ তুলনামূলক কম, আর সরকারি চাকরিতে প্রতিযোগিতা তীব্র। ফলে সাফল্যের পরও অনিশ্চয়তা যেন পিছু ছাড়ে না।

সাফল্যের সঙ্গে সংশয়ের লড়াই

ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আফিয়া আহমেদ স্নাতকে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। তবুও নানা সময় পরিচিতজনদের কাছ থেকে তাঁকে শুনতে হয় এমন মন্তব্য, যা তাঁর অর্জনের গুরুত্বকে খাটো করে। আফিয়া বলেন, ভালো ফলের পরও অনেক সময় মনে হয়—এই সাফল্যের বাস্তব মূল্য কতটুকু? তবে পরিবারের সমর্থন তাঁকে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।

বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আফিয়া বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অন্যদিকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রুবিনা ইয়াসমিন মনে করেন, ভালো ফলাফলের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ৩.৮২ সিজিপিএ পাওয়া এই শিক্ষার্থীর মতে, উচ্চশিক্ষা বা শিক্ষকতায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ফলাফলই প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তিনি জোর দেন দক্ষতা উন্নয়নের ওপর। তাঁর মতে, ভাইভা, প্রেজেন্টেশন ও ব্যবহারিক মূল্যায়ন বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে আরও প্রস্তুত হয়ে উঠবে।

পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর কৌশলই সাফল্যের চাবিকাঠি

মুন্সিগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম সমন্বিত মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। তাঁর সিজিপিএ ৩.৩৯। তিনি মনে করেন, শুধু গাইডবই নয়, মূল বইভিত্তিক পড়াশোনাই শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে।

শফিকুল নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি বিগত কয়েক বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করেছেন, যা তাঁকে পরীক্ষার ধরন বুঝতে সহায়তা করেছে। গণিত ও পরিসংখ্যানের মতো বিষয়গুলো তিনি নিজস্ব নোটের মাধ্যমে সহজ করে নিতেন। খাতার উপস্থাপনা, চিত্র ও গ্রাফ ব্যবহারের দক্ষতাও তাঁকে বাড়তি নম্বর পেতে সাহায্য করেছে।

এই প্রস্তুতির ফল তিনি ইতিমধ্যেই পাচ্ছেন। ২০২৬ সালে দেওয়া তিনটি চাকরির পরীক্ষার মধ্যে দুটি প্রিলিমিনারি পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এতে বিসিএসের লক্ষ্যে তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে।

সব মিলিয়ে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো ফলাফল যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, তেমনি সামনে এনে দেয় নতুন চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও দক্ষতা অর্জনই হয়ে উঠছে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সে ধরনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত বিসিএসকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরে এগোতে থাকেন। কিন্তু শুধু বিভাগে ভালো ফল করলেই যে সবাই বিসিএসে ভালো করবেন, বিষয়টি তেমনও নয়। তাই এ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য কলেজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য জব প্রিপারেশন ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করা হচ্ছে, পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রমকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যেন তাঁরা চাকরির বাজারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে সেখানকার শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ইব্রাহিম আলী, অধ্যক্ষ, রাজশাহী কলেজ

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত
ভালো ফলাফল অর্জন করেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আলমিনা আক্তার। ৩.৮০ সিজিপিএ এবং আইইএলটিএস-এ ৭ স্কোর থাকা সত্ত্বেও বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে।

আলমিনার ভাষ্য, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে আবেদন করতে গেলে শুধু একাডেমিক ফল নয়, থিসিস, গবেষণা এবং প্রজেক্টভিত্তিক কাজের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমে এ ধরনের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের উপস্থাপন করতে গিয়ে পিছিয়ে পড়েন।

ছবিটি প্রতীকী। প্রথম আলোর অনুরোধে মডেল হয়েছেন বিএল কলেজের শিক্ষার্থী আফ্রিদিছবি: সাদ্দাম হোসেন
তিনি মনে করেন, এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। বর্তমান বিশ্বে কেবল সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতা ও গবেষণা অভিজ্ঞতার মূল্য বেশি। তাই স্নাতক পর্যায় থেকেই বাধ্যতামূলক থিসিস ও প্রজেক্ট অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। অন্যথায় মেধাবী অনেক শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ হারাবে।

কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রামের সরকারি কমার্স কলেজের মাস্টার্স শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম খলিলও একই ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করেছেন বার আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এবং মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অর্জন করেছেন।

তাঁর মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে একাডেমিক পরিবেশে স্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে। নিয়মিত সেমিনার, গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।

ইব্রাহিম বলেন, পাঠ্যক্রম আরও আধুনিক করা এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। বর্তমানে চাকরির বাজারে ভালো ফলাফল অর্জনকারী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অতিরিক্ত কোনো সুবিধা পান না। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে কাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।

সব মিলিয়ে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো ফলাফল অর্জন শুধু সাফল্যের সূচক নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।