
রাত নয়টার শেষ শো ধরার তাড়া। অটোরিকশায় উঠে গন্তব্য বললাম—চেলোপাড়ার মধুবন মাল্টিপ্লেক্স। সময় কম, তাই আর দেরি না করে পৌঁছে গেলাম হলে।
জেলা শহরের সিনেমা হল বলে খুব সাধারণ কিছুই আশা করেছিলাম। কিন্তু ভেতরে ঢুকে চমকে উঠলাম—পরিপাটি, আধুনিক পরিবেশ। ১৯৭৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই হলটি একসময় বন্ধ ছিল, পরে সংস্কার করে আবার চালু করা হয়েছে।
‘রাক্ষস’–এর পোস্টারে সুস্মিতা ও সিয়াম। ছবি: ফেসবুক থেকে
ঈদের পর প্রায় তিন সপ্তাহ পার হয়েছে, তার ওপর পরদিন স্থানীয় নির্বাচনের দিন। তাই দর্শক কম থাকবে—এটাই স্বাভাবিক ধরে নিয়েছিলাম। বর্তমানে অনেক হলেই দর্শক কমে যাওয়ার প্রবণতা আছে। তাই দর্শকসংখ্যা নিয়ে না ভেবে সিনেমার কথাতেই আসা যাক।
ঈদের ছবি হিসেবে “রাক্ষস” নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। কিন্তু বড় পর্দায় ছবিটি দেখতে গিয়ে মনে হলো—এ নিয়ে কিছু বলা দরকার। তবে এটাকে কঠোর বিশ্লেষণ না ভেবে হালকা অভিজ্ঞতা হিসেবেই নেওয়া ভালো।
অনেকেই বলেন, সিনেমার আসল শক্তি গল্প। কিন্তু এখানে মনে হয়েছে, নায়কই সবচেয়ে বড় শক্তি—গল্প কখনো কখনো দুর্বল হয়ে পড়েছে। কাহিনিতে এক ধরনের অস্থির গতি আছে, যা দর্শককে টেনে রাখে, আবার কিছু প্রশ্নও তৈরি করে। যেন কোথাও কিছু অপূর্ণ থেকে যায়।
রাক্ষস–এ সিয়াম আহমেদ ও সুস্মিতা চ্যাটার্জি। ছবি: প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক থেকে
তবে যারা ‘নায়ককেন্দ্রিক’ সিনেমা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। আর পুরো ছবির ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সিয়াম আহমেদ। পরিচালক তাঁকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন, আর সিয়ামও দক্ষতার সঙ্গে চরিত্রটি ধরে রেখেছেন—পুরোটা জুড়েই তাঁর উপস্থিতি স্থির।
সিয়ামের আগের কাজগুলো—“পোড়ামন ২”, “মৃধা বনাম মৃধা”, “জংলি”—প্রতিটিতেই তিনি আলাদা মাত্রা দেখিয়েছেন। “রাক্ষস”-এ সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। এখানে একদিকে নির্মমতা, অন্যদিকে ভালোবাসা—দুটি বিপরীত বৈশিষ্ট্য তিনি একসঙ্গে তুলে ধরেছেন। মনে হয়েছে, তিনি যেন নিজের আগের কাজকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ছবির শেষে এমন কিছু ইঙ্গিত আছে, যা পুরো গল্পকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তবে দর্শকের অভিজ্ঞতা নষ্ট না করতে সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
গল্পে কিছু দুর্বলতা থাকলেও সিয়ামের অভিনয় অনেকটাই তা ঢেকে দিয়েছে। দর্শককে ধরে রাখার পেছনে তাঁর ভূমিকাই সবচেয়ে বড়। অনেকের কাছে এটি পরিচালকের চেয়ে বেশি নায়কের ছবি বলেই মনে হতে পারে।
সহশিল্পীদের মধ্যে সোহেল মণ্ডল ভালো করেছেন। আবরার আতহারও নজর কেড়েছেন। আগে নির্মাতা হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখানে অভিনেতা হিসেবে তাঁর উপস্থিতি আলাদা করে চোখে পড়ে।
নায়িকা হিসেবে সুস্মিতা চ্যাটার্জি সংযত অভিনয় করেছেন। তাঁর উচ্চারণে সচেতনতা ছিল। তবে কিছু চরিত্র প্রত্যাশা অনুযায়ী শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে আলীরাজ নিজের জায়গায় ঠিকই প্রভাব ফেলেছেন।
রাক্ষস–এ সিয়াম আহমেদ ও সুস্মিতা চ্যাটার্জি। ছবি: প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক থেকে
ছবির আরেকটি দিক উল্লেখযোগ্য—অ্যাকশনের তীব্রতার বিপরীতে গানগুলো অনেকটা নরম ও মনোরম। নায়ক-নায়িকার রসায়ন ভালোভাবে কাজ করেছে। লোকেশন ও কোরিওগ্রাফিও নজর কাড়ে। পেছনের সংগীতও দৃশ্যগুলোকে প্রাণবন্ত করেছে।
কিছু দর্শক ছবিটির সঙ্গে অন্যান্য বড় অ্যাকশনধর্মী সিনেমার তুলনা টানছেন। বাস্তবতা হলো—ছবিটি বিনোদন দিতে সক্ষম। যদিও যুক্তির দিক থেকে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়—কিছু ঘটনা বাস্তবসম্মত মনে হয় না। তবে এমন ‘ম্যাস’ সিনেমা দেখতে গেলে সবসময় যুক্তির খাতা খুলে বসা ঠিক নয়।
হলের ভেতরে একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো—দর্শক কম হলেও যারা ছিলেন, তারা মনোযোগ দিয়ে পুরো ছবিটি দেখেছেন। মাঝপথে মনোযোগ হারানোর দৃশ্য চোখে পড়েনি।
ছবি শেষে বের হয়ে কিছু দর্শকের সঙ্গে কথা হলো। কেউ বললেন, গল্পে কিছু প্রশ্ন থাকলেও সিয়ামের অভিনয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত দেখেছেন। আবার কেউ মনে করেন, দেশেও বড় মাপের অ্যাকশন সিনেমা তৈরির সম্ভাবনা আছে—এই ছবিটি তার ইঙ্গিত দেয়।
অটোরিকশা চালকের সঙ্গেও ছবিটি নিয়ে আলোচনা হলো। তাঁর ভালো লেগেছে, তবে শেষ নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। তিনি জানালেন, আগে শহরে অনেক সিনেমা হল ছিল, এখন হাতে গোনা কয়েকটি।
আজকের দিনে প্রশ্নটা থেকেই যায়—দর্শক আছে, আগ্রহও আছে, কিন্তু হল কোথায়? আর হল থাকলেও মানসম্মত বাণিজ্যিক সিনেমা কি নিয়মিত তৈরি হচ্ছে?
বছরে দুই ঈদে কয়েকটি ছবি দিয়ে কি একটি দেশের সিনেমাপ্রেম মেটানো সম্ভব?