
ঢাকা: দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ নিশ্চিত করা, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার দাবি তুলে ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধে সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি ইলিশ ভারত হয়ে তৃতীয় কোনো দেশে পুনঃরপ্তানির অভিযোগের বিষয়টিও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন এ নোটিশ পাঠান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নোটিশের প্রাপক করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দেশের মানুষের কাছে ইলিশের চাহিদা থাকলেও স্থানীয় বাজারে এর দাম বর্তমানে অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
নোটিশে দাবি করা হয়েছে, এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম দেশের বাজারে প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তা, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না করে বিদেশে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলে স্থানীয় ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে—এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে আইনি নোটিশে।
নোটিশে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অতীতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ইলিশের সংকট ও উচ্চমূল্য থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক কম দামে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করা হয়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি বলে নোটিশে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি করা ইলিশের একটি অংশ ভারতীয় কিছু আমদানিকারক তৃতীয় দেশের বাজারে পুনঃরপ্তানি করে বেশি মুনাফা করছে—এমন অভিযোগও নোটিশে তোলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন বাজারের নাম সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ইলিশ যদি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রপ্তানি না করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশ নিজেই ইলিশ রপ্তানি থেকে তুলনামূলক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে—এমন একটি প্রস্তাবও নোটিশে দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে সরাসরি রপ্তানির জন্য স্বচ্ছ ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশের প্রকৃত মূল্য বিবেচনায় নিয়ে রপ্তানি নীতি তৈরি করা হলে দেশের রপ্তানিকারক ও অর্থনীতি উভয়ই উপকৃত হতে পারে।
একই সঙ্গে দেশের বাজারে ইলিশের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে দাম আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই রপ্তানি নীতিতে ভোক্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
আইনি নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী সাত দিনের মধ্যে ভারতে ইলিশ রপ্তানি সংক্রান্ত কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ, নির্বাহী অনুমোদন বা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইলিশের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমিয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ইলিশ শুধু একটি জনপ্রিয় মাছ নয়, এটি দেশের মৎস্য অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দেশের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেদের জীবিকা থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ইলিশের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্তে উৎপাদক, জেলে, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক এবং ভোক্তা—সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইলিশের বাজারদর নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগের পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিষয়টিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে দেশের বাজারে সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ইলিশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা—দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই নীতিনির্ধারণের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
আইনি নোটিশে মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইলিশ রপ্তানি নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ভারতে রপ্তানি এবং সেখান থেকে তৃতীয় দেশে পুনঃরপ্তানির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা যাচাই করে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এখন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ নোটিশের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। সাত দিনের সময়সীমার মধ্যে সরকার কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয় কি না কিংবা ইলিশ রপ্তানি নিয়ে নতুন কোনো নীতিগত অবস্থান ঘোষণা করে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে আইনি নোটিশে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ইলিশ রপ্তানি ও পুনঃরপ্তানির প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য, বাণিজ্যিক নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।