কুবিতে সাবেক শিক্ষার্থীর হলের কক্ষ দখলের অভিযোগ, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন - Uttorpatro TV

কুবিতে সাবেক শিক্ষার্থীর হলের কক্ষ দখলের অভিযোগ, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: September 15, 2026

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বিজয়-২৪ হলের একটি কক্ষ দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শেষ হলেও তিনি হলের ২১৬ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছেন। এ ঘটনায় হল প্রশাসন অবহিত হওয়ার পর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, মোস্তাফিজুর রহমান শুভ ইংরেজি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছে প্রায় এক দশক আগে। এরপরও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ছাত্রদলের আগের কমিটিতে তিনি সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ গত ১৮ জুন ঘোষিত নতুন কমিটিতে তাঁকে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগে বিজয়-২৪ হলের ২১৬ নম্বর কক্ষে ওঠেন শুভ। এর আগে কক্ষটিতে তিন শিক্ষার্থী অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে তাঁরা কক্ষটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে কক্ষটির পুরোটা একাই শুভ ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শুরুতে তিনি গভীর রাতে হলে প্রবেশ করতেন। পরে দিনের বিভিন্ন সময়ও তাঁকে হলে অবস্থান করতে দেখা যায়। এমনকি অন্যদের নজর এড়াতে কক্ষে থাকা অবস্থায় দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রাখতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর হলে অবস্থানের দাবির পক্ষে কয়েকটি ছবি ও ভিডিও ফুটেজ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান শুভ। তাঁর দাবি, তিনি হলে ওঠেননি এবং সেখানে নিয়মিত থাকেনও না। বিজয়-২৪ হলের কাছেই তাঁর একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে এবং গত দুই বছর ধরে তিনি সেখানেই বসবাস করছেন বলে জানান।

শুভর ভাষ্য, একদিন রাতে অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার পর বাসার দারোয়ানকে খুঁজে না পাওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে হলে এক রাত অবস্থান করেছিলেন। তাঁর মতে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে হলে থাকার অভিযোগ ছড়াচ্ছে।

এদিকে ২১৬ নম্বর কক্ষটিতে আগে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিয়ান আরিফ, একই শিক্ষাবর্ষের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আশরাফ মুন্না এবং মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত অবস্থান করতেন বলে জানা গেছে। রিফাতের বরাদ্দকৃত সিটে একসময় তাঁর ভাই মুনতাসীর বিল্লাহও থাকতেন। মুনতাসীর ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। এছাড়া ওই কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী ফ্লোরিং করেও থাকতেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, মোতাসিম বিল্লাহ রিফাতই ছাত্রদল নেতা মোস্তাফিজুর রহমান শুভকে ওই কক্ষ ব্যবহারে সহযোগিতা করেছেন। তবে তিনিও অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।

মোতাসিম বিল্লাহ রিফাতের দাবি, শুভ হলে ওঠেননি। বিভিন্ন প্রয়োজনে তিনি দুই-তিন দিন হলে অবস্থান করেছেন। তাঁর মূল বাসস্থান বিজয়-২৪ হলের দক্ষিণ পাশে একটি ভবনে বলে দাবি করেন রিফাত।

বিষয়টি নিয়ে বিজয়-২৪ হল প্রশাসনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হলটির প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাসান খান জানিয়েছেন, শুভ হলে ওঠার বিষয়ে তাঁকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বিষয়টি জানার পর তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খোঁজ নেন এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও উপ-উপাচার্যকে অবহিত করেন।

তবে পরবর্তীতে এ বিষয়ে তাঁদের কাছ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা পাননি বলে জানান হল প্রভোস্ট। ফলে অভিযোগের পরও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলে থাকার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কারা হলে থাকতে পারবেন এবং কীভাবে আসন বণ্টন হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে।

এ বিষয়ে কুবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, প্রত্যেক আবাসিক হলের নিজস্ব থাকার নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতিমালা অনুসারে হলের আসন বণ্টনের দায়িত্ব প্রভোস্টের। কেউ নীতিমালা লঙ্ঘন করলে হল প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

অন্যদিকে, শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মো. আবুল বাশার জানিয়েছেন, হলে কে অবস্থান করছেন বা কে কোন কক্ষে উঠেছেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব নেই, তাদের হলে থাকার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই চূড়ান্ত।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের প্রশ্ন শোনার পর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে আসন সংকট ও শিক্ষার্থীদের আবাসন-সংক্রান্ত নানা সমস্যা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা থাকলেও একজন সাবেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আবাসিক কক্ষ ব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে বিষয়টি সামনে এনেছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের নীতিমালা ও আসন ব্যবস্থাপনার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হবে। আর অভিযোগ সত্য নয় হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয় এবং অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত হয় কি না—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।