জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব আইরিন জুবাইদা খান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে নতুন দায়িত্বে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
শনিবার ঢাকায় পাওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন আইরিন খান। পরিচয়পত্র পেশের মাধ্যমে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কর্মজীবনে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, শরণার্থী সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং টেকসই উন্নয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেছেন আইরিন খান। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার রয়েছে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আইরিন খানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সাল থেকে তিনি মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষা ও প্রসারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ দায়িত্বে তিনি বিশ্বজুড়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।
এর আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন আইরিন খান। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে আইরিন খানের নেতৃত্বের সময় বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি, নির্যাতন, বৈষম্য ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সংগঠনটির কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার বিষয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করতে সহায়ক হয়।
শুধু মানবাধিকার নয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও আইনের ক্ষেত্রেও তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল’ অর্গানাইজেশন বা আইডিএলওর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত এই প্রতিষ্ঠানে তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে নতুন দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এরও আগে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়—ইউএনএইচসিআরে—দীর্ঘ ২১ বছর কাজ করেন আইরিন খান। সেখানে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ভারতে চিফ অব মিশন এবং ডিভিশন অব ইন্টারন্যাশনাল প্রটেকশনের উপ-পরিচালকের দায়িত্বও রয়েছে।
শরণার্থী সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিয়ে ইউএনএইচসিআরে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষ, শরণার্থী এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক মানবিক সংকট, শরণার্থী ইস্যু ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
মানবাধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য আইরিন খান আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ২০০৬ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ সিডনি পিস প্রাইজে ভূষিত হন। শান্তি ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
আইরিন খান একজন লেখকও। দারিদ্র্য ও মানবাধিকারের সম্পর্ক নিয়ে তার লেখা ‘দ্য আনহার্ড ট্রুথ: পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ বইটি উল্লেখযোগ্য। বইটিতে দারিদ্র্যকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখে মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
শিক্ষাজীবনেও আইরিন খানের আন্তর্জাতিক পরিসরে উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল’ স্কুলে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। আইন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতা জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের নতুন দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের পক্ষে তিনি এখন বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশন, আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাও তার দায়িত্বের অংশ হবে।
বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রেও তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। একই সঙ্গে মানবাধিকার, শরণার্থী সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক আইন এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে তার দীর্ঘদিনের কাজ বহুপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
বিশেষ করে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইরিন খানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার পর এবার তিনি বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে একই সংস্থার কূটনৈতিক কাঠামোয় কাজ করবেন। ফলে তার নতুন দায়িত্ব আন্তর্জাতিক মহলে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে আইরিন খানের কার্যক্রম এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহের বিষয়। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বার্থ, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে দেশের অবস্থান তুলে ধরবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।