কাগজে-কলমে নয়, এবার খেলাপির ঋণ বাস্তবে আদায়ে জোর সরকারের - Uttorpatro TV

কাগজে-কলমে নয়, এবার খেলাপির ঋণ বাস্তবে আদায়ে জোর সরকারের

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 25, 2026

রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু হিসাবের পরিবর্তন বা ঋণের শ্রেণি পরিবর্তনকে যথেষ্ট মনে করছে না সরকার। ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করতে এবার প্রকৃত নগদ অর্থ আদায়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিল বা হিসাবের কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা বন্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ মনে করছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও খেলাপি ঋণের হার এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের চেয়ে বেশি। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ১৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এটিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও একটি দক্ষ ও সুস্থ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মানদণ্ডে এ হার আরও কমিয়ে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার।

সম্প্রতি সোনালী ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ব্যাংকটির আর্থিক ও পরিচালন পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণ, ঝুঁকি, সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়, শুধু কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে সন্তুষ্ট থাকার সুযোগ নেই। ঋণ থেকে প্রকৃত অর্থ আদায় এবং ব্যাংকের নগদ প্রবাহ শক্তিশালী করাই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধা নিয়েও আলোচনা হয়। এই সুবিধার মাধ্যমে শ্রেণিকৃত ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। তবে সরকার চায়, সুবিধাটি যেন ঋণ নিষ্পত্তি ও নগদ অর্থ আদায়ের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনোভাবেই এটি যেন খেলাপি ঋণ দীর্ঘায়িত করার নতুন কৌশলে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের কোন ধরনের ও কতসংখ্যক শ্রেণিকৃত ঋণ ‘এক্সিট’ সুবিধার আওতায় আসতে পারে, কতটি আবেদন জমা পড়েছে এবং এর মধ্যে কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব বিষয়েও পরিচালনা পর্ষদের কাছে তথ্য জানতে চাওয়া হয়। এর মাধ্যমে বিশেষ সুবিধায় ঋণ নিষ্পত্তির বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করতে চায় সরকার।

এদিকে উৎপাদনশীল খাত ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ও কুটির শিল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষি, নারী উদ্যোক্তা, নতুন উদ্যোক্তা এবং উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে সোনালী ব্যাংকের বড় শাখা নেটওয়ার্ক ও শক্তিশালী আমানতভিত্তি কাজে লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারের মতে, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই যথেষ্ট নয়। ব্যাংকের অর্থায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাস্তব অবদান রাখতে হবে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোনালী ব্যাংকের বিস্তৃত উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে অর্থায়ন পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে ঋণ বিতরণ বাড়াতে গিয়ে যাতে ভবিষ্যতে নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছে সরকার। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের ব্যবসার সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, ব্যবসার কার্যকারিতা, প্রকৃত মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বড় ঋণের ক্ষেত্রে শুধু জামানতের মূল্য বিবেচনা না করে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ পর্যাপ্ত জামানত থাকলেও ঋণগ্রহীতার নিয়মিত নগদ প্রবাহ না থাকলে পরবর্তীতে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সোনালী ব্যাংকের মতো বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অন্য ব্যাংকগুলোর জন্য অনুসরণীয় হওয়া উচিত বলেও বৈঠকে মত দেওয়া হয়। পরিচালনা পর্ষদকে দৈনন্দিন ঋণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ না করে কৌশলগত সিদ্ধান্ত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নীতি নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপনার জবাবদিহির দিকে বেশি নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা, পরিপালন ব্যবস্থা, বড় ঋণের মান, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া ঋণ এবং ঝুঁকির কেন্দ্রীভবন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও পরিচালনা পর্ষদকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।

ব্যাংকের বড় শাখা নেটওয়ার্কের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে লেনদেন ব্যয় কমানো, গ্রাহকসেবা সহজ করা এবং সরকারি অর্থ পরিশোধ, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, প্রবাসী আয় ও কৃষক কার্ডের মতো সেবাগুলো আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।

আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসকে সামনে রেখে সোনালী ব্যাংকের জন্য কয়েকটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খেলাপি ও ঋণ হিসাব থেকে বাদ দেওয়া ঋণ থেকে নগদ আদায় বৃদ্ধি, মানসম্পন্ন ঋণ বিতরণের মাধ্যমে অগ্রিম-আমানত অনুপাত যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা, কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যয় দক্ষতা ও টেকসই মুনাফা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন শক্তিশালী করা।

পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশনাও রয়েছে।

সোনালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে আগামী দিনে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে মান নিশ্চিত করা, সুশাসন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণে ব্যাংকটির কার্যক্রম আরও জোরদার হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।