রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে না: ভারতীয় হাইকমিশনার - Uttorpatro TV

রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে না: ভারতীয় হাইকমিশনার

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 24, 2026

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে মতপার্থক্য বা টানাপোড়েন থাকলেও তার প্রভাব দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও ভালো হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ভারতের হাইকমিশনার। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য বা টানাপোড়েন থাকা স্বাভাবিক। তবে এসব বিষয় যেন অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনীতি তার নিজস্ব গতিতে চললেও বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দুই দেশকেই কাজ করতে হবে।

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক মেধা ও সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দুই দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে। তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা উভয় দেশের দায়িত্ব।

দীনেশ ত্রিবেদী আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। কোনো দেশই অন্য দেশের চেয়ে বড় বা ছোট নয়। দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। এ ধরনের সমতাভিত্তিক সহযোগিতাই ভবিষ্যতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় গুরুত্ব

বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে বন্ধ থাকা সীমান্ত হাটগুলো পুনরায় চালু করা, স্থলবন্দরগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা এবং স্থলপথে সুতা আমদানির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্য পরিচালনা আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দুই দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে যৌথ বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় হাইকমিশনারের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এ খাতে ভারত জিপার, বোতাম, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারে। দুই দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ ধরনের সহযোগিতা বাড়লে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও বাড়বে।

সীমান্ত বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ

বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সীমান্ত হাটগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো ও কার্যক্রম আরও কার্যকর করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চীনের পর ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সহজ ও কার্যকর করা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে।

সম্পর্ক উন্নয়নে অর্থনীতিকে গুরুত্ব

দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে মতপার্থক্য থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনগণের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সীমান্ত যোগাযোগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়লে তা শুধু অর্থনীতিতেই নয়, সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দুই দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই দেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক ইস্যু থাকলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতার জায়গাগুলো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

তিনি দুই দেশের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখতে চায় না ভারত।

সোমবারের বৈঠক ও পরবর্তী বক্তব্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সীমান্ত হাট চালু, স্থলবন্দর কার্যকর করা, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা কমানো এবং যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন গতি পেতে পারে।

সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক অঙ্গনে টানাপোড়েন থাকলেও অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থে বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। একই সঙ্গে সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভালো হওয়ার আশাবাদও জানিয়েছেন তিনি।