নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্রে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে রাজস্ব আদায়, সরকারি ঋণ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
সোমবার আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরে সিপিডি। অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে, যেখানে আগে থেকেই বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা ছিল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির পরিস্থিতিও তখন খুব একটা অনুকূল ছিল না। ফলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথ শুরু থেকেই চ্যালেঞ্জের ছিল।
তবে সরকারের একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক কোনো দলিল তৈরি না করার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, সরকার বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার কঠিন পরিস্থিতির কথা বললেও সেই সময় অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা কী ছিল, তা নিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করা হয়নি। ফলে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রভাব ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
সংস্কার কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ মূল্যায়নের জন্য প্রায় ৩৬২টি উদ্যোগকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব উদ্যোগকে নয়টি ভাগে ভাগ করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সরকারের ইশতেহারে যেসব কমিশন ও সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, তার সবগুলো বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়।
সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা ও পদক্ষেপ মূল্যায়ন করেছে সিপিডি। এর মধ্যে সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, কিছু ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা রাজস্ব আদায়। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪২ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে সিপিডি।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রবৃদ্ধিও কমেছে। সিপিডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণও বেড়েছে। সিপিডির হিসাবে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি নিট বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণও কিছুটা কমেছে। আগের ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে তা কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
শিল্প খাতের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি। জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ সময়ের মধ্যে দেশের তিন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল—গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীতে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানা বন্ধের কারণে সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
শিল্প উৎপাদনের পরিসংখ্যানেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমে এসেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে।
সিপিডির মূল্যায়নে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও রাজস্ব আদায়, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দুর্বলতা রয়েছে। ফলে অর্থনীতিকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করাতে সরকারের সংস্কার উদ্যোগে আরও সমন্বয়, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সামগ্রিকভাবে সিপিডির পর্যবেক্ষণ হলো, নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু অগ্রগতি থাকলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় পুনরুদ্ধার এখনো দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে রাজস্ব ঘাটতি ও শিল্প খাতে কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়টি সামনে রেখে আগামী দিনগুলোতে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কার বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।