রংপুর নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় ঘটেছে এক লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পর পর চার সদস্যের লাশ উদ্ধার হওয়ার পর পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্কের পাশাপাশি শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পর কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও হত্যার মূল কারণ বা জড়িতদের পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য।
যেভাবে প্রকাশ্যে এলো ঘটনা
স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকে পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। মৃত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৬ মিনিটে শেষবার তাঁর বড় বোন ও ভাগনির সঙ্গে কথা হয়। এরপর রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার ফোন থেকে আবার কল আসলেও তিনি ঘুমিয়ে থাকায় তা ধরতে পারেননি। পরের দিন শুক্রবার থেকে আর তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
শনিবার বিকেলের দিকে বারবার ফোন দিয়েও মোবাইল বন্ধ পেয়ে পূজা চক্রবর্তীর মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। রাত পৌনে ৯টার দিকে তিনি কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়া এলাকায় গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন মূল ফটকে তালা ঝুলছে এবং বেল বাজালেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলছে না। বাধ্য হয়ে তিনি পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে বোনের বাসায় যান এবং আলো জ্বেলে জানালার থাই গ্লাসের লক ভেঙে ভেতরে তাকাতেই ঘরের আসবাবপত্র তছনছ দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্থানীয় থানায় খবর দেন।
লাশ উদ্ধারের গা শিউরে ওঠার দৃশ্য
সংবাদ পেয়ে রংপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশ ও সিআইডির সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তারা ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করেন।
শোবার ঘর: দ্বিতীয় তলার শোবার ঘরের খাটের পাশে গলায় কাপড় প্যাঁচানো অবস্থায় পড়ে ছিল ১০ বছর বয়সী শিশু আয়ুশের লাশ।
সিঁড়ি ঘর: তিনতলায় ওঠার সিঁড়িতে মেলে প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল।
ছাদ: ভবনের তিনতলার ছাদে পাওয়া যায় গৃহকর্তা গণপতি চক্রবর্তীর নিথর দেহ। তাঁর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।
পুলিশ ও সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত চারটি লাশের মুখমণ্ডলেই হালকা ঝলসানো দাগ ছিল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা রাসায়নিক কোনো পদার্থ বা কেমিক্যাল ব্যবহার করে তাঁদের প্রথমে অচেতন বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করে থাকতে পারে। লাশগুলোতে পচন ধরে ভবনে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা দেখে ধারণা করা হচ্ছে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
তছনছ করা আসবাব কিন্তু অক্ষত জিনিসপত্র: ডাকাতি না শত্রুতা?
ঘটনা তদন্তে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, ভবনের তিনটি ঘরের আলমারি ও ড্রয়ার খোলা এবং কাপড়-চোপড়, খেলনাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র বিছানা ও মেঝেতে ছিটকে আছে। তবে কোনো আলমারি বা ড্রয়ার বলপ্রয়োগ করে ভাঙা হয়নি; বরং ঘরের ভেতরে থাকা চাবি দিয়ে সেগুলো চতুরতার সঙ্গে খোলা হয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো—ঘরে থাকা ল্যাপটপ, টেলিভিশন কিংবা মূল্যবান মুঠোফোনগুলো দুর্বৃত্তরা স্পর্শও করেনি। আলমারি থেকে কোনো নগদ অর্থ বা স্বর্ণালংকার লুট হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যা নাকি পূর্বশত্রুতার জের ধরে ঘটনাকে ডাকাতি হিসেবে সাজানোর চেষ্টা—তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেশীদের বিস্ময় ও ক্ষোভ
জনবহুল মাছুয়াপাড়া এলাকায় এমন একটি চার তলা ঘেরা ভবনে একসঙ্গে চারজনকে হত্যা করে ঘাতকরা নিখোঁজ হয়ে গেল, অথচ পাশের কেউ বিন্দুমাত্র টের পেল না—বিষয়টিকে অদ্ভূত বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। পাশের ভবনে বসবাসকারী প্রতিবেশী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিমাংশু রায় জানান, তারা রাতে কোনো গোলমাল বা অস্বাভাবিক শব্দ পাননি।
প্রতিবেশী নমিতা রানী ও নিহত আগামীর সহপাঠীদের ভাষ্যমতে, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ছিল অত্যন্ত মার্জিত, শান্ত ও মিশুক প্রকৃতির। অবসর নেওয়ার পর গণপতি বাবু ঘরেই হোমিও চিকিৎসা দিতেন। কারও সঙ্গে এই পরিবারের বিন্দুমাত্র শত্রুতা বা দ্বন্দ্বের কথা তাদের জানা নেই।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য ও বর্তমান অবস্থা
রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানিয়েছেন, “হত্যাকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের ভেতরে অবস্থান নিয়ে সুযোগ বুঝে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে বলে মনে হচ্ছে। এটি নিছক ডাকাতি, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত জড়িয়ে রয়েছে—সব দিক বিবেচনায় রেখে আমাদের তদন্ত দল কাজ করছে।”
রংপুর কোতোয়ালি থানার কর্মকর্তা জানান, লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও সিআইডির ফরেনসিক দলের আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্রুতই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ক্লু উন্মোচিত হবে বলে আশা করছে পুলিশ।