গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পে বড় ধাক্কা, শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ - Uttorpatro TV

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পে বড় ধাক্কা, শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 16, 2026

দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট তীব্র হওয়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে উৎপাদনমুখী শিল্পখাত। গ্যাসনির্ভর নিত্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাত, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। কোথাও উৎপাদন সীমিত পর্যায়ে চলছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কারখানার কার্যক্রম। একই সঙ্গে বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে গ্যাসনির্ভর নয়—এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও সমস্যায় পড়েছে।

শিল্পমালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না। কোথাও শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমানো হচ্ছে, আবার চাপ কিছুটা বাড়লে সাময়িকভাবে উৎপাদন চালু করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহেই বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বেশ কিছু কারখানাও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে চিনি, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা ও ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে। কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মজুত পণ্য ধীরে ধীরে বাজারে ছাড়ছে।

নিত্যপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের পাইকারি বাজারেও। উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় চিনির সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা ও সুজির উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাজার একেবারে খালি হয়ে যাওয়া ঠেকাতে সীমিত পরিমাণে পণ্য সরবরাহ করছে।

গ্যাস সংকটের কারণে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে। ইস্পাত, ওষুধ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে কোথাও কোথাও ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখা হচ্ছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে ডিজেল ব্যবহার করতে হলে বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ওষুধশিল্পে সংকটের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসনির্ভর কারখানা একবার বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় উৎপাদন স্বাভাবিক করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। ফলে কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি অতিরিক্ত খরচ হলেও ডিজেল ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করছে। তবে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করাও সব সময় সহজ হচ্ছে না।

সিরামিক খাতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস ছাড়া সিরামিক উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো পরিচালনা করা কঠিন হওয়ায় একটি বড় প্রতিষ্ঠানের একাধিক ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় ডিজেল ব্যবহার করে সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা চলছে।

চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) বিভিন্ন কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে টেক্সটাইল, ডাইংসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলেও এতে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। জেলার টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় স্থানীয় শিল্পের পাশাপাশি দেশের কাপড়ের সরবরাহব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গাজীপুর, সাভার ও ময়মনসিংহের ভালুকাতেও গ্যাসের চাপ ওঠানামা করছে। কিছু কারখানায় উৎপাদন লাইন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও গ্যাসের চাপ কম থাকায় শ্রমিকদের কাজ না থাকলেও কারখানায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে কর্মঘণ্টার অপচয় এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যয় দুটোই বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিক ছাঁটাই নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

খুলনা অঞ্চলে আবার বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব বেশি। বিশেষ করে হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সংরক্ষণ ও উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

তবে সংকটের মধ্যে কিছুটা আশার খবরও এসেছে। এলএনজি সরবরাহের কয়েকটি টার্মিনাল আংশিক বা পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ আগের তুলনায় বাড়লেও চাহিদার সঙ্গে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলে শিল্পখাতে স্বাভাবিক উৎপাদন ফিরতে আরও সময় লাগতে পারে।

শিল্পমালিকেরা বলছেন, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।