চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আবারও ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ট্র্যাজেডি। উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ড’-এ পুরোনো জাহাজ কাটার কাজ করার সময় এক ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৮ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং ১০ জনেরও বেশি শ্রমিক আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শুক্রবার সকালে সাধারণ দিনের মতোই কাজের ব্যস্ততা শুরু হয়েছিল ভাটিয়ারীর ওই শিপইয়ার্ডে। প্রথাগত নিয়মেই বিশাল আকৃতির একটি স্ক্র্যাপ বা পুরোনো জাহাজ কাটার কাজ করছিলেন কয়েক ডজন শ্রমিক। কিন্তু কাজ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো ইয়ার্ড এলাকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জাহাজের ভেতরের অংশে আগুনের কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই শিপইয়ার্ডে কর্মরত অন্যান্য সহকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধারকাজে অংশ নেন। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে দগ্ধ ও আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) আলমগীর হোসেন ঘটনার ভয়াবহতা ও প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ৮ জন শ্রমিকের মধ্যে চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তারা হলেন— স্থানীয় ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। নিহত বাকি শ্রমিকদের পরিচয় উদঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।
চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি থাকা আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের শরীরের বড় অংশ দগ্ধ হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তাদের কয়েকজনের অবস্থা এখনো অত্যন্ত সংকটজনক।
শিপইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানিয়েছেন, জাহাজ কাটিংয়ের কাজ চলাকালীন আকস্মিকভাবে এই বিস্ফোরণ ঘটে। তবে কী কারণে এমন ভয়াবহ কণ্ড ঘটল, তা তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি।
প্রাথমিক তদন্ত ও ফায়ার সার্ভিসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পুরোনো জাহাজের ভেতরের আবদ্ধ চেম্বারে বা পাইপলাইনে জমাপাত হওয়া ক্ষতিকারক ও দাহ্য গ্যাস কিংবা বাষ্প থেকে এই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। জাহাজ ভাঙার শিল্পে কাটিং সরঞ্জাম ব্যবহারের আগে জাহাজটিকে পুরোপুরি ‘গ্যাস ফ্রি’ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে জাহাজটি সঠিকভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, কিংবা নিরাপত্তা পরীক্ষার যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং শিল্প দেশের অর্থনীতিতে কাঁচামাল ও রাজস্ব সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এর আগেও এই অঞ্চলের একাধিক ইয়ার্ডে বিপজ্জনক কাজের পরিবেশ ও সঠিক সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে শত শত শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং তদন্তকারী দলকে দেখতে হবে:
দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি আগে কী ধরনের জ্বালানি বা রাসায়নিক বহন করছিল?
ইয়ার্ডে আনার পর এটি কাটার জন্য প্রয়োজনীয় ‘গ্যাস ফ্রি’ সার্টিফিকেট সঠিক উপায়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না?
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার আগে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অগ্নি-প্রতিরোধক পোশাক দেওয়া হয়েছিল কি না?
এদিকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পর থেকে নিহতের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চমেক হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ও ভাটিয়ারীর স্থানীয় এলাকা। একই পরিবার থেকে দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। স্থানীয় অধিবাসী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো অনতিবিলম্বে নিহত পরিবারগুলোর জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
একই সাথে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শ্রমিকের প্রাণ এভাবে অবহেলায় ঝরে না পড়ে, সে জন্য দেশের সব শিপইয়ার্ডে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যবাধকতার সাথে প্রয়োগের জোর দাবি জানানো হচ্ছে।