ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি: জিয়াউলের নেতৃত্বে গুলি করে পেট কেটে লাশ নদীতে ফেলার লোমহর্ষক বর্ণনা মনিরুলের - Uttorpatro TV জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য: গুম ও খুনের চাঞ্চল্যকর বিবরণ

ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি: জিয়াউলের নেতৃত্বে গুলি করে পেট কেটে লাশ নদীতে ফেলার লোমহর্ষক বর্ণনা মনিরুলের

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 30, 2026

বিগত দেড় দশকের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রকাশ পাচ্ছে নিত্যনতুন লোমহর্ষক তথ্য। বহুল আলোচিত ও বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রদত্ত দীর্ঘ জবানবন্দিতে তিনি তৎকালিন র‌্যাব কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় সংঘটিত বিভিন্ন গুম, শারীরিক নির্যাতন, ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা এবং লাশ গুম করার বিভৎস চিত্র তুলে ধরেন।

জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক জানান, ২০১০ সালে তিনি যখন র‌্যাব-৮ বরিশাল ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন র‌্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে একটি বোটে করে বিশেষ অভিযানে যাওয়া হয়। বোটের ভেতর হাত ও চোখ বাঁধা বেশ কয়েকজন বন্দি ছিলেন।

অভিযান চলাকালে বোটের ছাদে বসে থাকা জিয়াউল আহসান ও তার সহযোগীরা একপর্যায়ে নিচে নেমে যান। মনিরুল হক পেছনে কী হচ্ছে দেখতে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেন, জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে চোখ ও হাত বাঁধা এক বন্দিকে বোটের প্রান্তে নিয়ে ভারী বস্তা বাঁধা হচ্ছে। এরপরই লোকটিকে সরাসরি গুলি করা হয় এবং পেট ছুরি দিয়ে কেটে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, যাতে লাশ কোনোভাবেই ভেসে উঠতে না পারে।

মনিরুল হক সেখান থেকে সরে আসার পর আরও কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ এবং ভারী বস্তু পানিতে ফেলার শব্দ শুনতে পান। পরবর্তীতে শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা লাশ ভেসে ওঠার খবর পাওয়া যায়, যা স্থানীয় বিডিআরের গোয়েন্দা শাখা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে বিডিআর সদস্য নজরুলের লাশ হিসেবে।

ট্রাইব্যুনালের জবানবন্দিতে তুলে ধরা হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বরগুনা ও বরিশাল অঞ্চলে গোয়েন্দা উইংয়ের বিভিন্ন অভিযানে ‘আলকাস’ নামের এক মাঝির বোট প্রায়শই ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার সন্দেহে জিয়াউল আহসান উক্ত মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ বা হত্যা করার নির্দেশ দেন র‌্যাব-৮-এর তৎকালীন কর্মকর্তা মেজর সাব্বিরকে।

তবে মেজর সাব্বির ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন অন্যায় নির্দেশ পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এর কিছুদিন পরই আলকাস মাঝির পরিবার র‌্যাব-৮ কার্যালয়ে এসে জানায় যে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্রিগেডিয়ার মনিরুল জানান, সাব্বির নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানানোর পর জিয়াউলের নেতৃত্বাধীন গোয়েন্দা উইং সরাসরি মাঝিকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিখোঁজ বা গুম করে।

সাক্ষী মনিরুল হক র‌্যাবের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী বৈঠকের ভয়ংকর কিছু চিত্রও উন্মোচন করেন। তিনি জানান, প্রতি মাসে অনুষ্ঠিত সিও’স কনফারেন্সে তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান গ্রেপ্তারকৃত দুর্ধর্ষ বা হাই-প্রোফাইল অপরাধীদের আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে মেরে ফেলার নির্দেশ দিতে ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করতেন।

এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত কথিত সফল অভিযানগুলো যে পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো ‘এনকাউন্টার’ ছিল, তাও জবানবন্দিতে নিশ্চিত করা হয়। ভোলা এবং সুন্দরবন অঞ্চলে পরিচালিত কয়েকটি অপারেশনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রাজু ডাকাতকে ধরার নামে পরিচালিত অভিযানে মূলত সাধারণ ভিকটিমদের আগেই টার্গেট এলাকায় এনে গুলি করে হত্যা করা হতো এবং পরবর্তীতে মিডিয়া বা সাংবাদিকদের সামনে সেটিকে রুটিন এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে প্রচার করা হতো।

সাবেক সেনা কর্মকর্তার এমন প্রত্যক্ষদর্শী মূলক তথ্য প্রদান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে যুক্ত হলো। বিগত সরকারের আমলে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল করতে এই জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ভিকটিম পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের বিচার পাওয়ার দাবির মুখে ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী পদক্ষেপে এই প্রমাণের ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।