আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ: নিট পরীক্ষা বিতর্কের নৈতিক দায় স্বীকার - Uttorpatro TV ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ | নিট-ইউজি বিতর্ক ও আন্দোলন

আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ: নিট পরীক্ষা বিতর্কের নৈতিক দায় স্বীকার

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 25, 2026
ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীরা। ২ জুন ২০২৬ছবি: এএফপি

নয়াদিল্লি: ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্নাতক পর্যায়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’ (NEET-UG) ঘিরে তৈরি হওয়া অভূতপূর্ব বিতর্ক ও টানা গণবিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে হলো কেন্দ্রকে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ব্যানারে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র আন্দোলনের পর ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার (২৫ জুলাই) তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) হিন্দিতে লেখা তাঁর একটি খোলা চিঠি পোস্ট করে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পদত্যাগের বার্তা

গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্ন ফাঁস ও কারচুপির অভিযোগ ওঠার পর থেকেই উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো ভারত। রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির চূড়ান্ত পর্যায়ে পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ক্ষতি রোধ করা এবং কোনো ‘দেশবিরোধী শক্তি’ যেন এই সুযোগে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছেন।

খোলা চিঠিতে বিদায়ী এই শিক্ষামন্ত্রী লেখেন, “প্রথম দিন থেকেই আমি আমার দায়িত্ব স্বীকার করেছি এবং এ পরিস্থিতি থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিইনি।” তিনি নিট পরীক্ষা ঘিরে সাম্প্রতিক সব জটিলতা ও বিশৃঙ্খলাজনিত ঘটনার নৈতিক দায়িত্ব নিজের ওপর নেন। তবে একই সঙ্গে সংকটের শুরু থেকেই সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের জোরালো সমর্থন জানান তিনি।

“দিল্লির যন্তর মন্তরসহ সারা দেশে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এবং দেশবিরোধী কোনো শক্তি যেন এর সুবিধা নিতে না পারে, দেশের ঐক্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যাতে আইনি জটিলতায় আটকে না যায়—সেসব নিশ্চিত করতেই আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।” — ধর্মেন্দ্র প্রধান, বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী

সরকারের পদক্ষেপ ও পুনঃপরীক্ষা

ধর্মেন্দ্র প্রধান তাঁর চিঠিতে আরও দাবি করেন, পরীক্ষা কেন্দ্রিক কারচুপি সামনে আসার সাথে সাথেই মোদি সরকার প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো বিলম্ব করেনি। তাত্ক্ষণিকভাবে পুরো তদন্তের ভার হস্তান্তর করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের (CBI) হাতে। পাশাপাশি বিতর্কিত পূর্বের পরীক্ষাটি বাতিল ঘোষণা করে অতি দ্রুত একটি স্বচ্ছ পুনঃপরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্যমতে, গত ২১ জুনের সেই পুনঃপরীক্ষা কেন্দ্র, রাজ্য সরকার এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অত্যন্ত নিখুঁত ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও অভিযোগ

নিউজ রিপোর্টে উঠে এসেছে, পুরো বিতর্ক চলাকালে বিরোধী পক্ষ ও দায়িত্বশীল পদে আসীন কিছু ব্যক্তি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। যদিও চিঠিতে তিনি সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করেননি, তবে গত কয়েক দিন ধরেই লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, গত ১০ দিনের নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে মানসিকভাবে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। তবে এটি তাঁর কোনো ‘ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াই’ নয়; বরং তরুণ সমাজের সুসুরক্ষা এবং ভারতের জাতীয় ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থেই তিনি ইস্তফা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান

বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী তরুণদের আবেগ ও ক্ষোভকে সম্মান জানিয়ে তাঁদের যেকোনো ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আইনি আইনি জটিলতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীরা দ্রুতই তাঁদের মনোযোগ আবার পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গঠনের দিকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন।

উল্লেখ্য, টানা আন্দোলনের মুখে মোদি সরকার সময় চাইলেও শিক্ষার্থীদের অটল অবস্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রভাবশালী এই মন্ত্রীকে চেয়ার ছাড়তে হলো। ঘটনাটি ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।