গতকাল নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল-রয়টার্স

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে যোগ হলো আরও একটি কালো অধ্যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে সেলেসাওরা। নিউ জার্সির মাঠে আর্লিং হলান্ডের জোড়া গোল এবং ব্রাজিলের পেনাল্টি মিসের খেসারত দিয়ে আরও একবার চূর্ণ হলো কোটি ভক্তের ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। এই বিদায়ের ফলে আসরসংখ্যার হিসাবে ব্রাজিল ফুটবল দল তাদের ইতিহাসের দীর্ঘতম ট্রফি-খরার রেকর্ড স্পর্শ করল।
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলই একমাত্র দল, যারা প্রতিটি আসরে অংশগ্রহণ করেছে। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে প্রথম ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে ব্রাজিলের সময় লেগেছিল দীর্ঘ ২৮ বছর। ১৯৩০ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পাঁচটি আসর ট্রফিশূন্য থাকার পর, ১৯৫৮ সালে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় তারা। এরপর ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং সর্বশেষ ২০০২ সালে পঞ্চম শিরোপা বা ‘পেন্টা’ জিতেছিল সাম্বা বালকেরা।
২০০২ সালের সেই সোনালী সাফল্যের পর থেকে বিগত ২৪ বছর ধরে প্রতি আসরেই ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্নে বুক বাঁধেন সমর্থকেরা। তবে ২০০৬ থেকে ২০২৬—টানা ছয়টি আসরে ট্রফিশূন্য থাকতে হলো তাদের। ২০৩০ সালের পরবর্তী বিশ্বকাপ যখন মাঠে গড়াবে, ততদিনে ব্রাজিলের এই অপেক্ষার সময়কাল ছোঁবে ২৮ বছর। অর্থাৎ, বছর এবং আসর—উভয় হিসাব মেলালে এটিই ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘতম শিরোপাহীন বন্ধ্যাত্ব।
২০০২ সালের পর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই ফেবারিটের তকমা নিয়ে মাঠে নেমেছে ব্রাজিল, কিন্তু প্রতিবারই নকআউট পর্বের দেয়াল পার হতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। বিগত ছয়টি আসরে ব্রাজিলের হৃদয়ভাঙার গল্পগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
২০০৬ বিশ্বকাপ (কোয়ার্টার ফাইনাল): রোনালদো, কাফু, রবার্তো কার্লোসদের নিয়ে গড়া তারকাখচিত দল নিয়ে জার্মানি গিয়েছিল ব্রাজিল। তবে ফ্রাঙ্কফুর্টের কোয়ার্টার ফাইনালে ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের জাদুকরী পারফরম্যান্সের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করে তারা। জিদানের পাস থেকে থিয়েরি অঁরির করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে বিদায় নেয় ব্রাজিল।
২০১০ বিশ্বকাপ (কোয়ার্টার ফাইনাল): কাকা ও রবিনিওদের নিয়ে গড়া কার্লোস দুঙ্গার ব্রাজিল বেশ গোছানো ফুটবল খেলছিল। পোর্ট এলিজাবেথে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে রবিনিওর গোলে প্রথমার্ধে এগিয়েও গিয়েছিল তারা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ডাচ তারকা ওয়েসলি স্নাইডারের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় সেলেসাওরা।
২০১৪ বিশ্বকাপ (সেমিফাইনাল): নিজেদের ঘরের মাঠে হেক্সা জয়ের সুবর্ণ সুযোগ ছিল ব্রাজিলের সামনে। কিন্তু সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক হার বিশ্বজুড়ে ব্রাজিল ভক্তদের স্তব্ধ করে দেয়। ফুটবল ইতিহাসে ‘মিনেইরাজ্জো’ নামে পরিচিত সেই ম্যাচে চোটের কারণে খেলতে পারেননি পোস্টার বয় নেইমার।
২০১৮ বিশ্বকাপ (কোয়ার্টার ফাইনাল): নেইমার, কুতিনিও, মার্সেলো ও কাসেমিরোদের ওপর ভর করে রাশিয়ায় স্বপ্ন দেখছিল ব্রাজিল। তবে কাজানে বেলজিয়ামের কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের কাছে পরাস্ত হতে হয় তাদের। ফার্নান্দিনিওর আত্মঘাতী গোল এবং কেভিন ডি ব্রুইনার দুর্দান্ত স্ট্রাইকে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় তিতের দল।
২০২২ বিশ্বকাপ (কোয়ার্টার ফাইনাল): কাতারের আল রাইয়ানে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগ ভাঙতে মরিয়া ছিল ব্রাজিল। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে নেইমারের জাদুকরী গোলে লিড নেয় দল। তবে ১১৭ মিনিটে ব্রুনো পেতকোভিচের গোলে সমতায় ফেরে ক্রোয়াটরা। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে হেরে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন নেইমার-রদ্রিগোরা।
বিগত আসরগুলোর মতো ২০২৬ বিশ্বকাপেও নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই বিদায় নিতে হলো ব্রাজিলকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে শেষ ষোলোর ম্যাচে ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ের মুখোমুখি হয়েছিল তারা। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ডের রুদ্রমূর্তির কাছে পরাস্ত হয় ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। ম্যাচের প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ব্রাজিলের মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারাইস, যা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
নরওয়ের পক্ষে জোড়া গোল করে ব্রাজিলের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেন হলান্ড। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে নেইমার একটি গোল পরিশোধ করলেও তা কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, পরাজয় এড়াতে পারেনি। ম্যাচ শেষে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় নেইমারসহ দলের অন্য ফুটবলারদের। এই হারের মাধ্যমে আরও একবার প্রমাণিত হলো, মাঠের রণকৌশল ও মানসিক দৃঢ়তার অভাবে বড় মঞ্চে বারবার খেই হারিয়ে ফেলছে সেলেসাওরা। ২০৩০ বিশ্বকাপে এই বন্ধ্যাত্ব ঘুচবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।