জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রোববারের ছবিসংসদ টিভির সৌজন্যে।

দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হলো। সাধারণত বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় সরকারি বরাদ্দ না পাওয়া বা বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ পুরনো। তবে এবার সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী আসনগুলোয় মসজিদ, কবরস্থান এবং ঈদগাহের উন্নয়নের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে এই অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে বলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সকালের দিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলে মন্ত্রী এই বক্তব্য দেন।
জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধির বিবৃতিতে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজস্ব ঐচ্ছিক তহবিল থেকে আমাদের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের আসনগুলোয় ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ মঞ্জুর করেছেন। এই অর্থ মূলত নির্বাচনী এলাকাগুলোর বিভিন্ন মসজিদ, গোরস্তান ও ঈদগাহের সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হবে।”
তবে এই বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট শর্ত বা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের সিটি করপোরেশন এলাকার অন্তর্ভুক্ত নির্বাচনী আসনগুলো আপাতদৃষ্টিতে এই বরাদ্দের আওতাভুক্ত হবে না। অর্থাৎ, কেবল গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের আসনগুলোই প্রাথমিকভাবে এই আর্থিক সুবিধা লাভ করতে যাচ্ছে।
মন্ত্রীর এই ঘোষণার পরপরই ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান নিজের আসন থেকে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চান। সিটি করপোরেশন এলাকা বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়েই সম্ভবত তিনি প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিলেন। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তৎক্ষণাৎ তাঁকে কথা বলার ফ্লোর দেননি। স্পিকার বরং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পুনরায় কথা বলার সুযোগ করে দেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে সিটি করপোরেশন এলাকার বিরোধী দলীয় এমপিদের আশ্বস্ত করে বলেন, প্রাথমিক ধাপে সিটি করপোরেশনের এলাকাগুলো এই বরাদ্দের বাইরে থাকলেও ভয়ের কিছু নেই। পরবর্তী সময়ে জেলা পরিষদের বিশেষ তহবিল ও ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে ওই সমস্ত সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোয় সমপরিমাণ বা প্রয়োজনীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। সরকারের এই সদিচ্ছার পর সংসদ কক্ষে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
মন্ত্রীর এই নজিরবিহীন বরাদ্দের ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশনে এক আবেগঘন ও চাঞ্চল্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্পিকারের আসনে বসা প্রবীণ রাজনীতিবিদ হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজের দীর্ঘ সংসদীয় জীবনের স্মৃতিচারণ করে একটি মন্তব্য করেন, যা পুরো সংসদের দৃষ্টি কাড়ে।
মির্জা ফখরুলের বিবৃতির পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “আমি নিজেও এই সংসদে দীর্ঘ ৪০টি বছর কাটিয়েছি। রাজনৈতিক জীবনের বড় একটা সময় আমিও এই সংসদের বিরোধী দলের বেঞ্চে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় বিরোধী দলে থাকাকালীন কোনো দিন একটি কানাকড়িও সরকারি বরাদ্দ বা তহবিল থেকে পাইনি।”
নিজের রাজনৈতিক ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে স্পিকার আরও যোগ করেন, “বিরোধী রাজনীতি করার কারণে জীবনের বিভিন্ন সময়ে পাঁচ-পাঁচবার আমাকে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যেতে হয়েছে। প্রাপ্তিযোগ বলতে কেবল এইটুকুই কপালে জুটেছে। এর বাইরে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রাপ্তিযোগে অন্য কিছু কোনো দিন আমার ভাগ্যে হয়নি।” স্পিকারের এই বাস্তব ও খোলামেলা বক্তব্যে সে সময় সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষের সংসদ সদস্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে বিরোধী দলের আসনে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও বৈষম্যহীন করবে। অতীতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ করতে না পারার যে আক্ষেপ করতেন, সরকারের এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপের ফলে সেই দূরত্বের অবসান ঘটবে এবং সব এলাকার জনগণ সুষম উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবে।