শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত চায় সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী - Uttorpatro TV ভারতে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার ও দেশে ফেরার গুঞ্জন: প্রত্যর্পণ চুক্তি নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী"

শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত চায় সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ২১, ২০২৬
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলেন ছবি: বাসস

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে মামলার মুখোমুখি করতে চায় সরকার। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি খুব শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এই গুঞ্জনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত আনতে বদ্ধপরিকর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে, যেন বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা যায়।”

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তখন থেকেই তিনি নয়া দিল্লিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করতে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারতের পক্ষ থেকে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ)’ কার্যকর হওয়া প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়। আসামের এনআরসি বা ভারতের সিএএ তাদের নাগরিকদের জন্য তৈরি করা নিজস্ব আইন। এ নিয়ে বাংলাদেশের কোনো বক্তব্য রাখার সুযোগ নেই। তবে ভারতের এই আইনের কারণে সীমান্ত দিয়ে যেন কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ (পুশ ইন) না ঘটতে পারে, সে জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের এক শিশুকে ধ*র্ষণ ও হত্যার ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামি সোহেল ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মূল আসামি ইতিমধ্যেই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। সরকার সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত শেষ করে আদালতে নিখুঁত চার্জশিট দাখিল করবে।

ছবি: সংগৃহীত

মন্ত্রী আরও দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, দ্রুততম সময়ে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যপরিধি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পুলিশ দুই ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে—‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ (প্রতিরোধমূলক) এবং ‘রি-অ্যাক্টিভ’ (প্রতিক্রিয়ামূলক)। মাদক, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চলমান যৌথ অভিযানগুলো মূলত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা রুখে দেয়। আর ধ*র্ষণ বা হত্যার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধ ঘটে গেলে রি-অ্যাক্টিভ ব্যবস্থা হিসেবে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার ও তদন্ত সম্পন্ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, অতীতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা বেশ কিছু স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর মামলা বর্তমান সরকার নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু হত্যা মামলা, কুমিল্লায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, বগুড়ায় তরুণী ধর্ষণ, কাপাসিয়ায় পাঁচ খুন এবং ঢাকার মান্ডায় প্রবাসী হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিশেষ অভিযানের তথ্য দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর ও আদাবর এলাকায় নিশ্ছিদ্র তল্লাশি ও ব্লক রেইড চলছে। এ ছাড়া গত ১৮ ও ১৯ মে যাত্রাবাড়ী ও তেজগাঁও থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০৪ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলেও র‍্যাব-১৫-এর বিশেষ অভিযানে দীর্ঘদিনের পলাতক অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আইন সংস্কারের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন সংস্কার একটি ধারাবাহিক ও চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে সব আইনকে পর্যায়ক্রমে যুগোপযোগী করা হবে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সাময়িক কোনো ক্ষোভ বা আবেগের বশবর্তী হয়ে চটজলদি নতুন আইন প্রণয়ন কিংবা বিশেষ আদালত গঠন করা মোটেও সমীচীন নয়। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার নামে যেন কোনো নাগরিকের প্রতি ‘অবিচার’ না হয় এবং কঠোর আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি না হয়, সেদিকেও সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।