জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ সোমবার সকালে ছবি: সংসদ টিভির সৌজন্যে

ঢাকা, ২৯ জুন ২০২৬: জাতীয় সংসদকে সরকারি দল ও বিরোধী দল—এই দুই ‘টায়ারের’ ওপর ভর করে চলা একটি বিশেষ যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো একটি টায়ারকে অকেজো বা ফুটো করে দিলে সংসদের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই বিরোধী পক্ষকে দুর্বল করার পুরোনো প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অতীতের তোষামোদ, ব্যক্তিপূজা এবং সংসদীয় চরিত্রহননের ‘ব্যাড কালচার’ চিরতরে বন্ধ করার আহ্বান জানান।
আজ সোমবার সকালে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা এই মন্তব্য করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের ঐতিহাসিক এই অধিবেশন শুরু হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর নিজের সমাপনী বক্তব্যে শফিকুর রহমান সংসদীয় গণতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, “একটি যানবাহনের যেমন দুটি টায়ারের প্রয়োজন হয়, এই সংসদেরও তেমনি দুটি টায়ার রয়েছে। একটি হলো সরকারি দল এবং অন্যটি বিরোধী দল। এর মধ্যে একটি টায়ার যদি অকেজো হয়ে পড়ে, তবে পুরো যানটি আর সচল থাকবে না। আপনি যদি এক টায়ারে পেরেক মেরে ফুটো করে দেন, তবে অন্য টায়ার দিয়ে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।”
তিনি বিরোধী দলকে কুচি কুচি করে কাটার পর নিজেদের দলে টানার রাজনৈতিক প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, সরকারি দল যা বলবে বিরোধী দল চোখ বন্ধ করে সব সমর্থন করবে—বিষয়টি এমন নয়। আবার কেবল বিরোধিতার খাতিরে সরকারের ভালো কাজের বিরোধিতা করাও সংগত নয়। সুশাসনের জন্য সরকারি ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষকেই সমান মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে।
অতীতের সংসদীয় রীতিনীতির কড়া সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, বিগত দিনে সংসদে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের খুশি করার জন্য গান, কবিতা ও কাল্পনিক স্বপ্নবিলাসের এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা দেখা যেত। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই পবিত্র সংসদ তোষামোদের জায়গা হতে পারে না, এটি মূলত দায়িত্ব পালনের জায়গা। তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সংসদে যেন কোনোভাবেই কারও চরিত্রহননের রাজনীতি প্রশ্রয় না পায় এবং অতীতের সমস্ত নোংরা সংস্কৃতিকে ‘না’ বলার সাহস যেন সংসদ সদস্যরা দেখান।
বাজেট বক্তৃতায় শফিকুর রহমান কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অধিকারের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররাও এই দেশের সমান নাগরিক। তাই তাদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই সরকারের উচিত তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে বাজেটে বিশেষ আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির বিষয়টি দ্রুত নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি।
উচ্চশিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সার্টিফিকেট বিতরণের কেন্দ্র না বানিয়ে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। তা না হলে দেশ চিরকাল আমদানিনির্ভরই থেকে যাবে। গবেষণার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ দায়িত্ব ও বাজেট দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করতে নতুন হাসপাতাল তৈরির চেয়ে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবল ও যন্ত্রাংশের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি দাবি করেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই পাচার হওয়া অর্থের মাত্র নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশের কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না। তিনি বলেন, শুধু টাকা আনলেই হবে না, সেই সাথে অর্থ পাচারের সাথে জড়িত অপরাধীদেরও আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে অনানুষ্ঠানিক বা অতিরিক্ত কর আদায়ের চাপ কমাতে হবে। করের ধাপ একটিই হওয়া উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারকে ট্যাক্স দিতে উৎসাহিত হন।
মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, যেখানে সরকারিভাবে মাত্র ৮৫ হাজার টাকায় মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা, সেখানে সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ প্রবাসীদের কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই মানবপাচার সদৃশ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে এবং প্রবাসীদের সার্বিক সমস্যা সমাধানে সংসদের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্ট যেমন—সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন, ভোলা সেতু নির্মাণ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সহায়তায় নেওয়া মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। যুবকদের স্বপ্নের একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ উপহার দিতে অতীতের গ্লানি ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি নিজের বক্তব্য শেষ করেন।