এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬: প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে পুলিশি হেফাজত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা - Uttorpatro TV সিলেটে এইচএসসি পরীক্ষার জাতি ধ্বংস করতে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করাই যথেষ্ট: শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন

এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬: প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে পুলিশি হেফাজত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 28, 2026
ছবিঃ সংগৃহীত

একটি জাতিকে পঙ্গু ও ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য কোনো পারমাণবিক বোমার প্রয়োজন হয় না, বরং সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিলেই পুরো রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এই কারণেই দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার সব ধরণের দুর্বলতা ও ত্রুটি দূর করতে বর্তমান সরকার নানামুখী সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আজ রোববার সকালে সিলেট নগরীর মেন্দিবাগ এলাকায় অবস্থিত জালালাবাদ গ্যাস ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এসব কথা বলেন। আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ২০২৬ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সিলেট শিক্ষা বোর্ড, সিলেট অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে এই সভার আয়োজন করা হয়।

শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বিগত দিনের উদাহরণ টেনে বলেন, “২০০১ সালে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং শিক্ষক সমাজের আন্তরিক সহযোগিতায় আমরা দেশকে একটি নকলমুক্ত পরীক্ষা উপহার দিতে পেরেছিলাম। এবারও পরীক্ষার সেই সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।”

তিনি স্পষ্ট করে জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁস করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসের অবাস্তব গুজব ছড়ানো—উভয় ক্ষেত্রেই প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে থাকবে। গত এসএসসি পরীক্ষার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, একটি নামী গণমাধ্যম এবং একজন সুপরিচিত ডাকসু নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসের দাবি করেছিলেন। কিন্তু বারবার প্রমাণ চাওয়া সত্ত্বেও তাঁরা কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রশ্ন ফাঁস হয়নি।

মন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কেউ সস্তা ভাইরাল হওয়ার জন্য কিংবা বিভ্রান্তি ছড়াতে অপপ্রচার চালালে সরকার চুপ করে থাকবে না। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়েছে। এখন থেকে কেউ প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। সত্যতা না মিললে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন ঠেকাতে সরকারের নতুন পরিকল্পনার কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৮০ সালের পুরনো নকল প্রতিরোধ আইনটিকে বর্তমান সময়ের উপযোগী করে আরও কঠোর ও আধুনিক করা হচ্ছে। নতুন এই আইন অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে নকল বা অন্য কোনো অনিয়ম ঘটলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার কেন্দ্র সচিবের ওপর বর্তাবে এবং তাঁর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। একই সাথে পরীক্ষা সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করায় এবারের এসএসসি পরীক্ষা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে শেষ হয়েছে। আগামীতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ প্রকল্প চালু করা হবে। শিক্ষকদের ডিজিটাল ট্যাব প্রদান করা হবে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় শ্রেণিকক্ষের সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিং করা হবে।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান শিক্ষক সংকট নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনার কারণে আজ অনেক স্কুল-কলেজে শিক্ষকের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে চলছে। এই সংকট গত চার মাসে তৈরি হয়নি। তবে বর্তমান সরকার বসে নেই, ধাপে ধাপে এই সংকট সমাধানের কাজ চলছে।”

তিনি আশ্বাস দেন যে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা শিক্ষকদের পদোন্নতি, নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং আইনি মামলার জট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী জুলাই মাস থেকেই শিক্ষক নিয়োগের মূল কার্যক্রম পুরোদমে জোরদার করা হবে। এর পাশাপাশি দেশের বিশাল জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (টিভেট) বা কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় এই ভোকেশনাল কোর্স চালু করা হবে।

সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী এবং মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিলকিস ইয়াছমীন।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত শিক্ষকেরা নব-সরকারি হওয়া কলেজের শিক্ষকদের পদোন্নতি জটিলতা, গ্রেড অবনমন, তীব্র শিক্ষক সংকট, এমপিওভুক্তি এবং আত্তীকরণসহ বিভিন্ন পেশাগত সমস্যা ও দাবি-দাওয়া মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। শিক্ষামন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে তাঁদের সমস্যাগুলো শোনেন এবং পর্যায়ক্রমে সব সমস্যা সমাধানের ইতিবাচক আশ্বাস দেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সচিব চৌধুরী মামুন আকবরসহ মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।