দেশের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম-নীতি ও আইনি বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক বিশাল নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) স্পষ্ট নির্দেশনা, আপত্তি ও অনুমোদন পত্র না থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ইউজিসি থেকে এই সব পদের বিপরীতে কোনো বাজেট বা বেতন বরাদ্দ না দিলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ফান্ড বা তহবিল থেকে অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এই অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই নজিরবিহীন অনিয়ম ও অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) এস এম হাসান তালুকদার, উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) এবং কতিপয় প্রভাবশালী শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি। একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক দুর্নীতি প্রকাশ পাওয়ায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
ইউজিসির আপত্তি ও অবৈধ নিয়োগের চিত্র
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেকোনো নতুন পদ সৃষ্টি এবং সেখানে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির পূর্বানুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। ইউজিসি নির্দিষ্ট কিছু পদের নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত আপত্তি এবং অননুমোদন পত্র জারি করা সত্ত্বেও, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই নির্দেশনা গোপন বা অগ্রাহ্য করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কোনো বৈধ ছাড়পত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। যেহেতু ইউজিসি এই পদের অনুকূলে কোনো অর্থ ছাড় করে না, তাই তাদের বেতন সচল রাখতে ভিসি ও প্রো-ভিসির নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিভিন্ন আপৎকালীন বা উন্নয়ন তহবিল (ফান্ড) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অডিট নিয়মের পরিপন্থী।
নেপথ্যে সিন্ডিকেট: ভিসি, প্রো-ভিসি ও ছাত্র প্রতিনিধি
অভিযোগ উঠেছে, এই পুরো অনিয়মের পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।উপাচার্য এস এম হাসান তালুকদার এবং প্রো-ভিসি তাদের নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে এই নিয়োগগুলো দিয়েছেন। এই চক্রের সাথে যুক্ত রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সুবিধাভোগী শিক্ষক এবং কতিপয় ছাত্র প্রতিনিধি।
ছাত্র প্রতিনিধিদের একটি অংশকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং অনৈতিক সুবিধার আশ্বাস দিয়ে এই অনিয়মের পক্ষে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। যেকোনো বৈধ প্রতিবাদ বা অভ্যন্তরীণ অডিট সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠলে এই ছাত্র প্রতিনিধি ও শিক্ষকরা মিলে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ফান্ড মূলত শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, গবেষণা, এবং জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে সংরক্ষিত থাকে। সেখান থেকে ইউজিসির অনুমোদনহীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, “নিয়ম অনুযায়ী যে ফান্ডের টাকা যে খাতে বরাদ্দ, তা অন্য খাতে খরচ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যা হচ্ছে, তা চরম আর্থিক অনিয়ম এবং এক ধরনের তহবিল
ছবিঃ উত্তরপত্র
তছরুপ।”
এই বিষয়ে জানতে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস এম হাসান তালুকদারের কার্যালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের গতি সচল রাখতেই কিছু জরুরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যদিও ইউজিসির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বেতন দেওয়া হচ্ছে—তার কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্বায়ত্তশাসিত বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি নির্দেশনার বাইরে গিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে অবৈধভাবে বেতন প্রদান করার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে উচ্চশিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হবে। সচেতন মহল এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।