পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সংবেদনশীল জাতীয় প্রকল্পে দুর্নীতির এক অবিশ্বাস্য অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্প ‘গ্রিন সিটি’র কেনাকাটায় যে অনিয়ম হয়েছিল, তা এখন ‘বালিশ-কাণ্ড’ হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। ২০১৯ সালে যে দুর্নীতির খবর ৫ হাজার ৯৫৭ টাকার বালিশ দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা বাস্তবে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে জানা গেছে।
সিএজির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ৬০টি বালিশের পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রতিটি ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ, একেকটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। এছাড়া আরও ৭২টি বালিশ কেনা হয় ২৯ হাজার ৮৪৭ টাকা দরে। ৬৬০টি বালিশের প্রতিটির মূল্য দেখানো হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং ১২০টি বালিশ কেনা হয় ১০ হাজার টাকারও বেশি দামে। অথচ বাজারমূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব বালিশের প্রকৃত দাম ছিল গড়ে ৩ হাজার টাকার আশেপাশে।
হিসাব অনুযায়ী, এই ৪ হাজার ৭০২টি বালিশের প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কিন্তু বিল তোলা হয়েছে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকার। শুধুমাত্র বালিশ কেনাকাটাতেই সরকারের ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম কেবল বালিশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রূপপুর প্রকল্পের ২০টি আবাসন ভবন নির্মাণ ও আসবাবপত্র কেনাকাটায় নানা কারসাজির মাধ্যমে সরকারের প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। সিএজি দপ্তর তাদের প্রতিবেদনে একে ‘সুস্পষ্ট অনিয়ম’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামক দুটি প্রতিষ্ঠান এই বিশাল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। অডিট চলাকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের কারণ জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সিএজি কার্যালয় থেকে ৩৮টি বিশেষ অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এই প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনার সময় বালিশের অবিশ্বাস্য দাম দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি কৌতুকচ্ছলে মন্তব্য করেন, এতো দামি বালিশ ইতিহাসের অংশ হিসেবে জাদুঘরে রাখা উচিত। একইসঙ্গে তিনি এই লুটপাটের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনাকে ‘সাগর চুরি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, সরকারি প্রকল্পে জনগণের অর্থের এমন অপচয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কেবল প্রশাসনিক শাস্তি বা বদলি করলেই হবে না, বরং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে ফেরত আনতে হবে।
দেশের এই বৃহৎ মেগা প্রকল্পে এমন দুর্নীতি ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, সিএজির এই প্রতিবেদনের পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কত দ্রুত কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।